পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা চলাকালীন এক আকস্মিক ও বিরল পদক্ষেপ নিল ইরান। কৌশলগতভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) জেনেভায় যখন ওমানি দূতের বাসভবনে দুই দেশের প্রতিনিধিরা বৈঠকে বসেছিলেন, ঠিক তখনই ইরান এই ঘোষণা দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮০-র দশকের পর এই প্রথম আন্তর্জাতিকভাবে এতটা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিল ইরান। এর ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
কেন এই কঠোর পদক্ষেপ? ইরানের ব্যাখ্যা
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই পদক্ষেপটি মূলত একটি সামরিক মহড়া এবং নৌ-নিরাপত্তার অংশ। মহড়া চলাকালীন ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) সরাসরি লাইভ মিসাইল বা তাজা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ওয়াশিংটনকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন:
“বিশ্বের শক্তিশালী সেনাবাহিনীও মাঝে মাঝে এমন চড় খেতে পারে যে, তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না। যুদ্ধজাহাজের চেয়েও বড় বিপদ হলো সেই অস্ত্র যা জাহাজকে ডুবিয়ে দিতে পারে।”
আলোচনার মাঝেই যুদ্ধের দামামা
একদিকে সামরিক মহড়া, অন্যদিকে কূটনৈতিক টেবিল, ইরানের এই দ্বিমুখী অবস্থান বিশ্ববাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে। জেনেভায় জাতিসংঘ নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশা ব্যক্ত করলেও জানিয়েছেন, যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও ‘রেড লাইন’
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন যে, আলোচনা কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক হয়েছে। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিছু ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা ইরান এখনো মেনে নেয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন রণতরীর উপস্থিতি ও তেলের বাজার
গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এটি আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করা ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’-এর সঙ্গে যোগ দিচ্ছে।
প্রভাব:
- তেলের বাজারে অস্থিরতা: হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এটি বন্ধের খবরে বিশ্ববাজারে তেলের দামে তাৎক্ষণিক অস্থিরতা তৈরি হয়।
- কূটনৈতিক চাপ: আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ইরান একটি বিস্তারিত প্রস্তাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই প্রস্তাবের ওপরই নির্ভর করছে পারমাণবিক অচলাবস্থা নিরসনের ভবিষ্যৎ।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব এক নজরে
হরমুজ প্রণালি হলো পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী একটি সরু জলপথ। কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?
- এটি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী।
- সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো এই পথটি ব্যবহার করে।
- এই পথটি বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট চরম আকার ধারণ করতে পারে।
ইরানের এই শক্তি প্রদর্শন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনড় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আগামী দুই সপ্তাহের আলোচনা এবং ইরানের প্রস্তাবই বলে দেবে এই সংকট নিরসনের কোনো পথ বের হবে কি না।








