যশোরে এক আলোচনা সভায় দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহমুদুর রহমান বলেছেন, ভারতের দালালি করে বাংলাদেশে আর কেউ ক্ষমতায় যেতে পারবে না, থাকতেও পারবে না। তার মতে, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না এবং যারা ভারতের দালালি করবে, জনগণ তাদের প্রতিহত করবে।
শনিবার বিকালে যশোর জেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জুলাই বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতি ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনাসভায় মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি এসব বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জ্ঞানচর্চাভিত্তিক সংগঠন প্রাচ্যসংঘ যশোর।
সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সুপ্রিম কাউন্সিল সদস্য আখতার ইকবাল টিয়া। বিশেষ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সদস্য ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল হামিদ এবং প্রাচ্যসংঘ যশোরের প্রতিষ্ঠাতা লেখক-গবেষক বেনজীন খান।
নির্বাচনে কারচুপি নয়, সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি চাই
মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে ড. মাহমুদুর রহমান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি কড়া ভাষায় আহ্বান জানান যে শুধু সরকার নয়, রাজনৈতিক দলও ভোট কারচুপির সঙ্গে জড়িত থাকে। তার দাবি, জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে আর কোনো দল নির্বাচন নিয়ে কারচুপির পথে হাঁটবে না। তিনি বিশ্বাস করেন, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেশের গণতন্ত্রকে আবার কার্যকরভাবে ফিরিয়ে আনতে পারে।
তার বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, বাইরে থেকে বিশেষ করে দিল্লি থেকে দেশকে বিপর্যস্ত করার নানা চেষ্টা চলছে। কিন্তু শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলে আর কেউ ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার সুযোগ পাবে না। জাতীয় রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে সরকার, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
দিল্লির আধিপত্য রুখতে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান
ড. মাহমুদুর রহমান বক্তব্যে পরিষ্কারভাবে বলেন যে বাংলাদেশে দিল্লির আধিপত্য দীর্ঘদিনের। কিন্তু এখন সময় এসেছে এই প্রভাবকে প্রতিহত করার। তিনি দাবি করেন, ১৮ কোটি মানুষের দেশে ভারতের আধিপত্য আর টিকবে না। জনগণ এখন আরও সচেতন এবং যে কেউ ভারতের দালালি করলে তা জনগণের চোখে ধরা পড়বে। তার মতে, যারা জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে ভারতের স্বার্থসিদ্ধিতে কাজ করবে, তারা রাজনৈতিক অঙ্গনে টিকে থাকতে পারবে না।
তিনি বলেন, “আমরা দল বুঝি না, আমরা শুধু বুঝি যে কোনো ভারতীয় দালাল যেন সংসদে যেতে না পারে।” তার ভাষায়, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর অবস্থানে।
জুলাই বিপ্লব, তরুণদের উত্থান ও নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্ম
সভায় তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, তরুণরা এখন দেশের নতুন রাজনৈতিক শক্তি। যারা জুলাইয়ে রাস্তায় নেমেছিল, তারা প্রত্যেকেই ভবিষ্যৎ রাজনীতির মূল অংশ হয়ে উঠেছে। কাউকে আর উপেক্ষা করা যাবে না।
তিনি বলেন, “জুলাই যুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রতিটি তরুণ এখন এই রাজনৈতিক শক্তির অংশ। দেশে নতুন এক পলিটিক্যাল পাওয়ার তৈরি হয়েছে, যাকে উপেক্ষা করা হলে ভুল হবে।”
সাংস্কৃতিক সংগ্রাম ছাড়া রাজনৈতিক সংগ্রাম বিজয়ী হয় না
নিজের বক্তব্যে তিনি শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, সাংস্কৃতিক সংগ্রামের গুরুত্বও তুলে ধরেন। তার দাবি, কোনো রাজনৈতিক সংগ্রাম সফল হয় না যদি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিজয় না আসে। তিনি বলেন, হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বিকৃত করেছে।
তার বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, আমরা বহু বই-পুস্তক লিখেছি ভারতীয়দের আদর্শকে অনুসরণ করে। সেখানে বাঙালি মুসলমানের প্রকৃত ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য স্থান পায়নি। তিনি মনে করেন, যদি পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষায় বাঙালি মুসলমানের মূল সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা যায়, তবে ব্রাহ্মণ্যবাদী সাংস্কৃতিক আধিপত্য পরাজিত হবে।
তার মতে, এই সাংস্কৃতিক যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারলে রাজনৈতিক সংগ্রামও সফল হবে এবং বাংলাদেশ আর কোনো ফ্যাসিস্ট শাসকের হাতে পড়বে না।
শেখ হাসিনার ‘ফিরে আসা’ প্রসঙ্গে মন্তব্য
সভায় উপস্থিতদের প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, শেখ হাসিনার পুনরায় ক্ষমতায় ফেরা অসম্ভব। তার ভাষায়, “হাসিনা আর ফিরবে না, ক্লোজড।” তিনি দাবি করেন, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হলে শেখ হাসিনার মতো “ফ্যাসিস্ট শক্তির” রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হয়ে যাবে।
ভোটারদের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা
সভায় ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভোট দিতে গিয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং কোনো ভারতীয় দালালকে ভোট দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির নাম নয়, বরং তাদের অবস্থানই আসল বিষয়। তিনি বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জনগণকেই শেষ কথা বলতে হবে।
ড. মাহমুদুর রহমান আশা প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশ এখন আর আগের মতো নয়। জনগণ এখন আরও রাজনৈতিকভাবে সচেতন। তাই দিল্লি চাইলে আর কখনো বাংলাদেশে আধিপত্য ধরে রাখতে পারবে না।
যশোরের আলোচনাসভায় সরব ছিল জাতীয় স্বার্থ ও গণতন্ত্রের কথা
পুরো আলোচনা সভার বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয় জাতীয় স্বার্থ, গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, সুষ্ঠু নির্বাচন, তরুণদের রাজনৈতিক জাগরণ এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর। বক্তারা মনে করেন, বাংলাদেশ এখন এক নতুন পরিবর্তনের পথে। এই পরিবর্তনকে এগিয়ে নিতে হলে সকলের ঐক্য প্রয়োজন।
সভায় উপস্থিত বিভিন্ন বক্তা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং বলেন, জনগণই দেশের মালিক। তাই জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।








