ভারত ফারাক্কা ব্যারাজের সবকটি গেট একযোগে খুলে দেওয়ার পর থেকেই আমাদের দেশের পদ্মা নদীতে হু হু করে পানি বাড়তে শুরু করেছে। উজানের পাহাড়ি ঢল ও অতিরিক্ত পানির চাপ সামলাতে ফারাক্কার মোট ১০৯টি গেটই এখন উন্মুক্ত। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ওপর। গত মাত্র তিন দিনেই রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার পানি প্রায় দুই মিটার পর্যন্ত বেড়ে গেছে। হুট করে এভাবে পানি বেড়ে যাওয়ায় রাজশাহীর নদীপাড়ের মানুষ এবং বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
নদীর তীরবর্তী নিচু এলাকা ও ফসলি জমি ইতিমধ্যেই তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। এভাবে পানি বাড়তে থাকলে খুব দ্রুতই বড় ধরনের বন্যার মুখে পড়তে পারে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিস্তীর্ণ অঞ্চল।
রাজশাহীতে দ্রুত বাড়ছে পদ্মার পানি, বিপৎসীমার কাছাকাছি প্রবাহ
পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পদ্মার পানি রাজশাহী পয়েন্টে খুব দ্রুত বিপৎসীমার দিকে ধাবিত হচ্ছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার হিসাব অনুযায়ী, সেখানে পদ্মার পানি ১৭ দশমিক ২৬ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল। এই পয়েন্টে ১৮ দশমিক ৫ মিটারে পৌঁছালেই পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করবে।
যদিও পানি এখনো বিপৎসীমার কিছুটা নিচে রয়েছে, কিন্তু উজানের পানি যেভাবে প্রবল স্রোতে নেমে আসছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে তা বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় স্থানীয় নদী তীরবর্তী মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ও গৃহপালিত পশু নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
পানিবন্দি চরাঞ্চল: মাঝচর, আষাড়িয়াদহ ও খিদিপুরে বাড়ছে দুর্ভোগ
ফারাক্কা দিয়ে আসা অতিরিক্ত পানির কারণে রাজশাহীর পবা ও গোদাগাড়ীর ভেতরের চরাঞ্চলগুলো ইতিমধ্যেই প্লাবিত হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে:
- মাঝচর
- আষাড়িয়াদহ
- খিদিপুর
এসব চরাঞ্চলের ঘরবাড়ি, চলাচলের মেঠো পথ এবং উঠান পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিতে ডুবে গেছে কৃষকের রোপণ করা বিভিন্ন ফসলি জমি। হঠাৎ পানি প্রবেশ করায় চরের সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন চলাচলে মারাত্মক সমস্যায় পড়েছেন। দ্রুত পানি সরানোর কোনো ব্যবস্থা না থাকায় চরাঞ্চলের পরিবারগুলোর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ভারতের উজান থেকে আসছে ১৬ লাখ কিউসেক পানি: গবেষণার চাঞ্চল্যকর তথ্য
কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদ্মা নদীর ভয়াবহ এই পরিস্থিতির কথা নিশ্চিত করেছেন। তার দেওয়া নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতে ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানির উচ্চতা ২৩ দশমিক ৭৫ মিটারে পৌঁছে গেছে।
ফারাক্কা এলাকার নিজস্ব বিপৎসীমা হলো ২২ দশমিক ২৫ মিটার। অর্থাৎ, সেখানে পানি বর্তমানে বিপৎসীমার প্রায় ১.৫ মিটার (দেড় মিটার) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ফারাক্কার ১০৯টি গেটই সম্পূর্ণ খুলে রাখা হয়েছে। বর্তমানে এই ব্যারাজ দিয়ে প্রায় ১৬ লাখ কিউসেক পানি তীব্র গতিতে নিচের দিকে নেমে আসছে। এর মধ্যে মাত্র ৪০ হাজার কিউসেক পানি ফিডার খাল দিয়ে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে, বাকি সব পানি সরাসরি বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
ভারতে তীব্র নদীভাঙন, বাংলাদেশে দ্বিগুণ আতঙ্কের ছায়া
ফারাক্কার অতিরিক্ত পানি ছাড়ার কারণে শুধু বাংলাদেশেই পানি বাড়ছে না, বরং ভারতের মুর্শিদাবাদের বেশ কিছু নদী তীরবর্তী এলাকায় নতুন করে তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। উজানে নদীর পাড় ভেঙে বিশাল এলাকা বিলীন হওয়ায় সেই বিপুল পরিমাণ পানির তোড় সরাসরি বাংলাদেশে এসে ধাক্কা দিচ্ছে।
গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ সতর্ক করে বলেছেন, যেভাবে একই গতিতে পানি বাংলাদেশে ঢুকছে, তাতে আগামী ১ থেকে ২ দিনের মধ্যে নতুন নতুন চরাঞ্চল প্লাবিত হবে। পানি মানুষের বাসাবাড়িতে ঢুকে ধ্বংসলীলা চালাতে পারে।
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিচু এলাকায় বাড়তি নজরদারির তাগিদ
পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলার চরাঞ্চল এবং নদীর তীরবর্তী নিচু এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে কড়া নজর রাখার তাগিদ দিয়েছেন।
পানি দ্রুত বাড়তে থাকলে চরাঞ্চলের পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে বা আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা প্রয়োজন। নদী ভাঙন রোধে এবং বাঁধ সুরক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের আগাম পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সতর্ক অবস্থান ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ
পদ্মা নদীর এমন ভয়াবহ রূপ দেখে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর জানিয়েছেন, তারা নদীর পানি বৃদ্ধির গতি ও পূর্বাভাসের তথ্যের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন।
নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে, যাতে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তবে নদীর পাড়ের মানুষ এখনই ভয়াবহ ভাঙন ও বন্যার ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারছেন না।
আমাদের করণীয় ও আগাম সতর্কবার্তা
পদ্মার পানি যেভাবে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, তাতে নদীতীরবর্তী মানুষকে এখনই সাবধান হতে হবে: ১. চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ খাবার পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র নিরাপদে সংগ্রহে রাখা উচিত।
২. গৃহপালিত পশু ও জরুরি মূল্যবান আসবাবপত্র উঁচু ও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করতে হবে।
৩. শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যাতে কেউ ভুলবশত ছলছল করা নদীর পানিতে নেমে না যায়।
৪. স্থানীয় প্রশাসন ও আবহাওয়া বার্তার তথ্যের দিকে সব সময় নজর রাখতে হবে।
ফারাক্কার গেট খোলা থাকায় আগামী কয়েক দিন পদ্মার পানি কমার কোনো লক্ষণ নেই। বরং এ পানি দ্রুত দেশের মধ্যাঞ্চলের দিকে বিস্তৃত হতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখা অত্যন্ত জরুরি।








