হৃদরোগ চিকিৎসায় অতি গুরুত্বপূর্ণ করোনারি স্টেন্ট বা প্রচলিত ভাষায় হার্টের রিং-এর দাম কমানোর যে সিদ্ধান্ত সম্প্রতি নেওয়া হয়েছে, তা ১ অক্টোবর ২০২৫ থেকে কার্যকর হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়াধীন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে এবং তা গণবিজ্ঞপ্তি আকারে প্রচার করে।
দাম সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে
গত ৩ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে করোনারি স্টেন্টের দাম সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক তিনটি প্রতিষ্ঠানের (মেডট্রোনিক, বস্টন সায়েন্টিফিক ও অ্যাবোট) তৈরি ১০ ধরনের করোনারি স্টেন্টের দাম পুনর্নিধারণ করা হয়।
উদাহরণস্বরূপ:
- মেডট্রোনিকের রিসলিউট অনিক্স স্টেন্টের দাম ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা থেকে কমে হয়েছে ৯০ হাজার টাকা।
- অনিক্স ট্রুকর ৭২ হাজার থেকে কমে ৫০ হাজার টাকা।
- অ্যাবোটের জায়েন্স প্রাইম ৬৬ হাজার ৬০০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, জায়েন্স আলপাইন ও জায়েন্স সিয়েরা ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা।
- বস্টন সায়েন্টিফিক প্রোমাস এলিট ৭৯ হাজার থেকে ৭২ হাজার টাকা, প্রোমাস প্রিমিয়ার ৭৩ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা, আর সাইনার্জি, সাইনার্জি শিল্ড ও সাইনার্জি এক্সডি ১ লাখ ১৭–১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা থেকে কমে ৯০ হাজার–১ লাখ টাকার মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে।

দাম কমানোর কারণ ও প্রেক্ষাপট
ডলারের দাম বাড়া এবং অতিরিক্ত ট্যাক্স, ভ্যাট ও চার্জের কারণে দেশে করোনারি স্টেন্টের দাম ক্রমাগত বাড়ছিল। এতে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর গত ১৬ এপ্রিল বিশেষজ্ঞ পরামর্শক কমিটি গঠন করে। তাদের সুপারিশ অনুযায়ী আমদানি করা করোনারি স্টেন্টের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
কার্যকর হওয়ার তারিখ নির্ধারণ
স্টেন্ট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, তাদের হাতে এখনও আগের দামে কেনা অনেক স্টেন্ট মজুদ আছে। এজন্য তারা নতুন দাম কার্যকর করতে কিছুটা সময় চায়। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেয় যে, ১ অক্টোবর ২০২৫ থেকে নতুন দাম কার্যকর হবে।
রোগীদের অভিযোগ ও করণীয়
গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে- কোনো হাসপাতাল (সরকারি বা বেসরকারি) যদি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা দাবি করে, রোগী বা তাদের স্বজনরা সরাসরি ১৬১২১ নম্বরে কল করে অভিযোগ জানাতে পারবেন।
এছাড়া বিলের কাগজ নিয়ে অনলাইনে অথবা জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করা যাবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জরিমানার ২৫% নগদ টাকা অভিযোগকারী পাবেন।
হাসপাতাল ও সার্ভিস চার্জ
স্টেন্টের নতুন নির্ধারিত দামের সাথে হাসপাতালগুলো সর্বোচ্চ ৫% পর্যন্ত সার্ভিস চার্জ নিতে পারবে। এর বেশি টাকা নিলে তা আইনের আওতায় আসবে।
দেশে স্টেন্টের প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার করোনারি স্টেন্ট ব্যবহৃত হয়। নিবন্ধিত ৩১টি কোম্পানি এসব স্টেন্ট আমদানি করে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশই আসে মেডট্রোনিক, অ্যাবোট এবং বস্টন সায়েন্টিফিক থেকে। এজন্য প্রাথমিকভাবে এই তিন প্রতিষ্ঠানের স্টেন্টের দাম পুনর্নিধারণ করা হয়েছে। বাকি কোম্পানিগুলোর স্টেন্টের দামও শিগগিরই পর্যালোচনা করা হবে বলে জানিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
কেন স্টেন্ট প্রয়োজন?
হৃদযন্ত্রে ধমনীতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে এনজিওপ্লাস্টি পদ্ধতির মাধ্যমে স্টেন্ট বা করোনারি স্টেন্ট বসানো হয়। সাধারণ মানুষ এটিকে ‘হার্টের রিং’ নামে চেনে। এটি হৃদপিণ্ডে রক্ত সঞ্চালন সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশে এসব স্টেন্ট আমদানি হয় যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত থেকে।
উপসংহার
স্টেন্টের দাম হ্রাস রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় অনেকটাই কমিয়ে আনবে। তবে বাস্তবে নির্ধারিত দাম যেন কার্যকর হয়, সে বিষয়ে নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সচেতন রোগী ও স্বজনরা এ উদ্যোগকে কার্যকর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।








