ফিলিস্তিনের গাজামুখী মানবিক ত্রাণবাহী বহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র প্রায় সব জাহাজ আটক করেছে ইসরায়েলি নৌবাহিনী। একটিকে বাদ দিয়ে মোট ৪০টি জাহাজ আটকের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক নিন্দা এবং তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ইউরোপ থেকে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য, বিশ্বজুড়ে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে ইসরায়েলের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন এবং দেশটির বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞার দাবি তুলছেন।
গাজার জন্য মানবিক মিশন
‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ ছিল একটি আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা, যার মূল উদ্দেশ্য অবরুদ্ধ গাজায় খাদ্য, চিকিৎসা সামগ্রী এবং শিশুখাদ্য পৌঁছে দেওয়া। জাতিসংঘ জানিয়েছে, প্রায় দুই বছরের যুদ্ধে গাজায় দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাই এই বহর শুধু ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার মিশনই নয়, বরং ইসরায়েলি অবরোধের বিরুদ্ধে এক দৃঢ় চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বিবেচিত হয়।
৩১ আগস্ট স্পেনের বার্সেলোনা থেকে যাত্রা শুরু করা এই বহরে ছিল মোট ৪১টি জাহাজ এবং চার শতাধিক যাত্রী। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রাজনীতিক, মানবাধিকারকর্মী এবং জলবায়ু আন্দোলনের অন্যতম মুখ গ্রেটা থুনবার্গ। এছাড়া বার্সেলোনার সাবেক মেয়র আডা কোলাউ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার নাতি ম্যান্ডলা ম্যান্ডেলাও ছিলেন যাত্রীদের তালিকায়।
বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ ও বিক্ষোভ
ইসরায়েলি বাহিনী ফ্লোটিলা আটকানোর পর থেকেই বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
- স্পেন: বার্সেলোনায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে স্লোগান দেন, “গাজা, তুমি একা নও”, “ইসরায়েলকে বর্জন করো” এবং “ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা চাই”। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে লাঠিপেটা হয়।
- আয়ারল্যান্ড: ডাবলিনে সংসদ ভবনের বাইরে কয়েকশ মানুষ বিক্ষোভ করেন। সেখানে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের সঙ্গে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আয়ারল্যান্ডের দীর্ঘ লড়াইয়ের তুলনা টানা হয়।
- ফ্রান্স: প্যারিসে এক হাজার মানুষ প্লেস দ্য লা রিপাবলিকে সমবেত হন। মার্সেইতে অস্ত্র প্রস্তুতকারী এক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ঘেরাও করতে গেলে কয়েকশ মানুষকে আটক করে পুলিশ।
- ইতালি: রোমে প্রায় ১০ হাজার মানুষ কলোসিয়ামের সামনে বিক্ষোভ করেন। এছাড়া মিলান, তুরিন, ফ্লোরেন্স ও বোলোনিয়াতেও মিছিল হয়। ইতালির প্রধান শ্রমিক ইউনিয়নগুলো সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।
- তুরস্ক: ইস্তাম্বুলে ইসরায়েলি দূতাবাস অভিমুখে বিশাল মিছিল হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেন, “সুমুদ নৌবহরের বন্দীদের মুক্তি চাই।”
- সুইজারল্যান্ড: জেনেভায় প্রায় তিন হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেন। পুলিশ জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও মরিচ স্প্রে ব্যবহার করে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে।
- জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, তিউনিসিয়া, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাতেও ফ্লোটিলা আটকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়।


আন্তর্জাতিক জলদস্যুতার অভিযোগ
ফিলিস্তিনি মানবাধিকার আইনজীবী ডায়ানা বুট্টু বলেছেন, ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ “আন্তর্জাতিক জলদস্যুতা” ছাড়া আর কিছু নয়। তিনি আল–জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, সব জাহাজই আন্তর্জাতিক জলসীমায় ছিল। বিদেশি পতাকা বহনকারী জাহাজে হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। তাঁর অভিযোগ, আটক যাত্রীদের জোরপূর্বক ইসরায়েলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যেখানে তাঁদের যাওয়ার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে প্রবেশের মামলা দিয়ে বহিষ্কারের চেষ্টা চলছে।
পরিবারগুলোর উদ্বেগ
ফ্লোটিলায় থাকা যাত্রীদের পরিবার ও স্বজনেরা তাঁদের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ করছেন। আয়ারল্যান্ডের মিরিয়াম ম্যাকন্যালি, যার মেয়ে ফ্লোটিলায় ছিলেন, বলেন—“আমি চিন্তিত হলেও গর্বিত। আমার মেয়ে মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়েছে।”
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি আহ্বান
ব্রাসেলসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সামনে প্রায় তিন হাজার মানুষ জড়ো হয়ে ইইউকে ইসরায়েলের সঙ্গে সব চুক্তি বাতিলের আহ্বান জানান। তাঁদের স্লোগান ছিল, “অবরোধ ভাঙো”।

মালয়েশিয়ায় ক্ষোভ
কুয়ালালামপুরে মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ হয়। একজন বিক্ষোভকারী বলেন, “তাঁরা শুধু ত্রাণ আর শিশুখাদ্য নিয়ে যাচ্ছিলেন। এই গ্রেপ্তার অন্যায়।”
ইসরায়েলের পদক্ষেপকে কেউ কেউ নিরাপত্তার অজুহাত বললেও অধিকাংশ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এটিকে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ঘোরতর লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন। সারা বিশ্বে ইসরায়েলবিরোধী প্রতিবাদ যত বাড়ছে, ফ্লোটিলা আটকের ঘটনাটি ইসরায়েলের জন্য নতুন কূটনৈতিক সংকট তৈরি করেছে।








