দেশের স্বর্ণের বাজারে বর্তমানে এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অনেকটা রূপকথার গল্পের মতোই এক দিনের ব্যবধানে একাধিকবার ওঠানামা করছে স্বর্ণের দাম। গত কয়েক দিনে দামের এই লঙ্কাকাণ্ড দেখে হতাশ সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে খোদ স্বর্ণ ব্যবসায়ীরাও। বর্তমানে ভালো মানের এক ভরি স্বর্ণ কিনতে ভ্যাট ও মজুরি মিলিয়ে প্রায় ৩ লাখ টাকার প্রয়োজন হচ্ছে।
রেকর্ড উচ্চতায় স্বর্ণের দাম: এক বছরেই বাড়ল ১.৫ লাখ টাকা
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) নির্ধারিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, স্বর্ণের বাজারে এখন অস্থিরতার পাহাড়। গত বৃহস্পতিবার দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দামে পৌঁছেছিল স্বর্ণ। সে সময় ভরিপ্রতি ১৬ হাজার ২১৩ টাকা বেড়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
মজার বিষয় হলো, ঠিক এক বছর আগে এই একই পরিমাণ স্বর্ণের দাম ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাত্র ১২ মাসের ব্যবধানে স্বর্ণের দাম বেড়েছে ভরিপ্রতি ১ লাখ ৫১ হাজার টাকা। এই নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধির ফলে স্বর্ণ এখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার পুরোপুরি বাইরে।
কেন এই অস্থিরতা? আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কারণসমূহ
বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের দাম বাড়ার পেছনে বেশ কিছু শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কারণ কাজ করছে।
১. বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা ও নিরাপদ বিনিয়োগ
অর্থনীতিবিদদের মতে, যখনই বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা দেখা দেয়, বড় বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজার বা বন্ড ছেড়ে স্বর্ণকে ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে বেছে নেন। ফলে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের চাহিদা ও দাম একযোগে বেড়ে যায়।
২. ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও যুদ্ধ
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা স্বর্ণের বাজারকে উত্তাল করে তুলেছে। যুদ্ধের সময় মানুষ নগদ টাকা বা কাগজের মুদ্রার চেয়ে স্বর্ণ মজুত করাকে বেশি নিরাপদ মনে করে।
৩. ডলারের মান ও ফেড রিজার্ভের প্রভাব
ডলারের দামের সাথে স্বর্ণের দামের এক বিপরীতমুখী সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’-এর চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং ডলারের প্রতি অনাস্থা বাড়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বড় পরিবর্তন এসেছে।
আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সকালে বাজুসের ঘোষণা অনুযায়ী দেশের বাজারে বিভিন্ন মানের স্বর্ণের নতুন দাম নিচে দেওয়া হলো:
| স্বর্ণের মান | বর্তমান দাম (ভরি) | পূর্বের দাম (ভরি) |
| ২২ ক্যারেট | ২,৫১,১৮৪ টাকা | ২,৫৭,৭৭৪ টাকা |
| ২১ ক্যারেট | ২,৩৯,৭৫৪ টাকা | ২,৪৬,০৫২ টাকা |
| ১৮ ক্যারেট | ২,০৫,৫২০ টাকা | ২,১০,৮৮৫ টাকা |
| সনাতন পদ্ধতি | ১,৬৮,১৯৫ টাকা | ১,৭২,৫৬৯ টাকা |
(দ্রষ্টব্য: এই দামের সাথে সরকারি ৫% ভ্যাট এবং নূন্যতম ৩-৬% মজুরি অতিরিক্ত যোগ হবে।)
সংকটে জুয়েলারি ব্যবসা: ক্রেতা নেই দোকানে
স্বর্ণের উচ্চমূল্যের কারণে দেশের স্বর্ণশিল্প এখন ধ্বংসের মুখে। বাজুসের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ব্যবহারিক প্রয়োজনে এখন কেউ স্বর্ণ কিনছেন না। বরং চড়া দামের সুযোগ নিয়ে অনেকে তাদের পুরনো জমানো স্বর্ণ বিক্রি করে দিচ্ছেন।
বড় বড় শোরুমগুলো এখন ক্রেতাশূন্য। রমজান ও ঈদের সামনে যেখানে কেনাকাটার ধুম পড়ার কথা, সেখানে বায়তুল মোকাররমের মতো বড় মার্কেটগুলোও এখন শুনশান। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী লোকসান সামলাতে না পেরে ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন।
বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে সিটি গোল্ড
স্বর্ণের দাম মধ্যবিত্তের হাতের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় মানুষ এখন বিকল্প পথ খুঁজছে। বিয়ের অলংকার বা উৎসবের সাজে স্বর্ণের জায়গা দখল করে নিচ্ছে ‘সিটি গোল্ড’ বা ‘গোল্ড প্লেটেড’ গয়না। বাজারে এই কৃত্রিম গয়নার চাহিদা এখন তুঙ্গে।
এই স্বর্ণের বাজারের অস্থিরতা কতদিন স্থায়ী হবে তা নির্ভর করছে বিশ্ব পরিস্থিতি ও ডলারের স্থিতিশীলতার ওপর। তবে বর্তমান উচ্চমূল্য দেশের সাধারণ মানুষ ও জুয়েলারি শিল্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিনের আপডেট পেতে আমাদের ওয়েবসাইটের সাথেই থাকুন।
স্বর্ণের দাম সম্পর্কিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: স্বর্ণের দাম কেন প্রতিদিন পরিবর্তন হয়?
উত্তর: আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম এবং দেশীয় বাজারে ডলারের মূল্যের ওপর ভিত্তি করে বাজুস প্রতিদিন দাম নির্ধারণ বা সমন্বয় করে থাকে।
প্রশ্ন: ব্যাগেজ রুল কী এবং এর প্রভাব কী?
উত্তর: বিদেশ থেকে স্বর্ণ আনার ক্ষেত্রে সরকারের কড়াকড়ি নিয়মই হলো ব্যাগেজ রুল। আমদানিতে কড়াকড়ির কারণে দেশে স্বর্ণের সংকট তৈরি হয় এবং দাম বাড়ে।
প্রশ্ন: এখন কি স্বর্ণ কেনা বুদ্ধিমানের কাজ হবে?
উত্তর: বিনিয়োগের জন্য স্বর্ণ নিরাপদ হলেও ব্যবহারিক ব্যবহারের জন্য বর্তমান চড়া দাম সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
প্রশ্ন: দুবাই ও বাংলাদেশের স্বর্ণের দামের পার্থক্য কত?
উত্তর: বর্তমানে দুবাইয়ের তুলনায় বাংলাদেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ভরিতে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা বা তার বেশি পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
প্রশ্ন: ভালো মানের স্বর্ণ চেনার উপায় কী?
উত্তর: সবসময় হলমার্ক (Hallmark) দেখে স্বর্ণ কিনুন। ২২ ক্যারেট স্বর্ণে ৯১.৬% বিশুদ্ধতা থাকে।








