দেশের জ্বালানি তেল ব্যবস্থাপনায় এক ভয়াবহ অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। একদিকে পেট্রোলপাম্পগুলোতে তেল পাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের দীর্ঘ হাহাকার, অন্যদিকে দেশীয় উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে জ্বালানি তেল কেনা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
সংকট কেন? সরকারি ব্যাখ্যা ও বাস্তবতা
বিপিসি সূত্র জানাচ্ছে, ডিপোগুলোতে অকটেন রাখার জায়গা নেই, তাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সরবরাহ নেওয়া কমানো হয়েছে। অথচ জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সরকারের দুর্বল সাপ্লাই চেইন পরিকল্পনারই বহিঃপ্রকাশ। যেখানে চাহিদার একটি বড় অংশ দেশীয় উৎপাদন থেকে আসে, সেখানে পরিকল্পিত মজুত ব্যবস্থা না থাকা এবং তড়িঘড়ি করে বিদেশ থেকে জাহাজ আসার পর স্থানীয় সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়াকে একটি ‘ভুলনীতি’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্থানীয় শিল্পের ওপর বড় আঘাত
দেশের অকটেন ও পেট্রোলের চাহিদার ৭৫ শতাংশ পূরণ করে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যাল’ একাই চাহিদার প্রায় ৪০-৪৫ ভাগ জোগান দেয়। অথচ ৮ এপ্রিল থেকে বিপিসি তাদের সরবরাহ নেওয়া বন্ধ রেখেছে। ফলে এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী প্রণব কুমার সাহা জানিয়েছেন, বিপিসির এই হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে তারা উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারছেন না।
জনদুর্ভোগ ও রেশনিংয়ের বিতর্ক
- রেশনিং ও আতঙ্ক: গত কয়েক মাস ধরে তেলের ওপর রেশনিং আরোপ করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় ১০ শতাংশ কম তেল দেওয়ার নির্দেশনা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও মজুতদারির প্রবণতা বাড়িয়েছে, যার খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।
- বিপিসির লোকসান: বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির ফলে লোকসান কমাতে বিপিসি চাহিদা অনুযায়ী তেল কেনাতেও কার্পণ্য করছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
- প্রধানমন্ত্রী তৎপর: সূত্র বলছে, জনগণের এই চরম ভোগান্তি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দফায় দফায় আলোচনা করছেন এবং সংকট নিরসনের নির্দেশনা দিচ্ছেন।
ডিজেলের স্বস্তির খবর
সংকটের মধ্যেও স্বস্তির খবর হলো ডিজেলের সরবরাহ। পর্যাপ্ত আমদানি ও যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় ডিজেল নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেকটাই কেটেছে। বর্তমানে দেশে ১ লাখ টনের বেশি ডিজেল মজুত আছে এবং চলতি মাসে আমদানির পরিমাণ ৪ লাখ ৭২ হাজার টনে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মন্তব্য
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় পরিপক্বতার অভাব স্পষ্ট। বিতরণ কোম্পানিগুলো কেরোসিনের ট্যাংক অকটেনের জন্য প্রস্তুত করতে পারেনি বলেই আজ এই দায় নিতে হচ্ছে জনগণ ও স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে।”
জ্বালানি তেল কোনো বিলাসিতা নয়, বরং দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বিপিসির ভুল পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতার দায় কেন জনগণ নেবে? অতি দ্রুত এই সাপ্লাই চেইন সংকট নিরসন এবং স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।








