ফেনী জেলা বিএনপির রাজনীতি হঠাৎই সরগরম। দলের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় নাম না থাকায় ব্যতিক্রমী এক প্রতিবাদে নেমেছেন দলের অন্যতম আলোচিত নেতা আলাল উদ্দিন আলাল। শুক্রবার (৭ নভেম্বর) সকালে ধানক্ষেতে গিয়ে তিনি আম্পায়ারের ভঙ্গিতে ‘রিভিউ’র আবেদন জানান। সেই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করতেই ভাইরাল হয়ে যায়।
এই ব্যতিক্রমী প্রতিবাদে যেমন হাস্যরস ছড়িয়েছে, তেমনি সৃষ্টি হয়েছে রাজনীতির নতুন আলোচনাও। অনেকে বলছেন, “ছবি যখন কথা বলে, তখন ক্যাপশনের দরকার পড়ে না।”
দলের প্রার্থী তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর আলালের প্রতিক্রিয়া
সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-২ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন আলাল উদ্দিন আলাল। কিন্তু গত ৩ নভেম্বর বিএনপি মহাসচিব ঘোষিত সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় তার নাম ছিল না। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি রিভিউ আবেদন জানান।
আলাল উদ্দিন বলেন, “দল প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমরা দলের সিদ্ধান্তই মানি। তবে দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছি।”
তিনি আরও জানান, “আমাদের তারেক রহমান সাহেবের নির্দেশ ছিল, আনন্দ-উল্লাস করা যাবে না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ফেনীতে হাইওয়ে ব্লক করে এমপি সাহেব নিজে উপস্থিত থেকে আনন্দ-উল্লাস করেছেন।”
ভিপি জয়নালের শোডাউন ও বিতর্কিত মন্তব্য
ফেনী-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ভিপি ঢাকা থেকে গাড়িবহরসহ এসে শোডাউন করেন। তিনি বক্তব্যে বলেন,
“আমাকে মনোনয়ন দেয়ায় ৯৯ ভাগ মানুষ খুশি, ১ শতাংশ চোর-ডাকাত নাখোশ।”
তার এই বক্তব্যে ক্ষোভ ছড়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনেক নেতা-কর্মী এ মন্তব্যকে দলের ভেতরে বিভাজন সৃষ্টি করার মতো বলে মন্তব্য করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল প্রতিক্রিয়া
আলাল উদ্দিন আলালের রিভিউ আবেদন নিয়ে ফেসবুকে শুরু হয় নানা প্রতিক্রিয়া।
বিএনপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক গাজী হাবিবুল্লাহ মানিক লিখেছেন,
“করোনা ও বন্যার সময় পাশে না থাকা একজন মানুষ নাকি এখন ফেনীবাসীর সেবা করবে! আন্দোলনে না থাকা ব্যক্তি এখন নির্যাতিত কর্মীদের চোর-ডাকাত বলছে।”
অন্যদিকে একজন নির্যাতিত নেতা লিখেছেন, “দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, তবে দল যেন এমন কাজ না করে, যার খেসারত আমাদেরই দিতে হয়।”
দলের ভেতর ভিন্নমত ও সমর্থনের স্রোত
ফেনী বিএনপির অনেকেই আলালের এই ব্যতিক্রমী প্রতিবাদকে সমর্থন জানিয়েছেন। কেউ লিখেছেন, “ছবিটাই ক্যাপশন।”
আবার কেউ বলেছেন, “ছবি যখন কথা বলে, তখন ক্যাপশন লাগে না।”
তবে অন্যদিকে শহিদুল আলম নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, “দল সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভিপি জয়নাল তিনবারের নির্বাচিত এমপি, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং অভিজ্ঞ নেতা। তার প্রার্থী হওয়ায় দলীয় বিভাজন রোধ হয়েছে।”
এই মতবিরোধই এখন ফেনী বিএনপির রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নেটিজেনদের চোখে ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ
নেটিজেনদের বড় অংশই এই ঘটনার ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। কেউ একে সুস্থ রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখছেন, কেউ আবার বলছেন,
“এমন প্রতিবাদে নেতাদের অনুভূতি প্রকাশ পায়, যা দলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই আসে।”
দিনভর ফেসবুকে আলালের সেই রিভিউ ভঙ্গির ছবিই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। মজার বিষয় হলো, আলাল ছবির ক্যাপশনে শুধু লিখেছিলেন “নো ক্যাপশন।”
রাতে সাক্ষাতের চেষ্টা, তবে দেখা হয়নি
দিনশেষে ফেনী বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ভিপি জয়নাল নিজে আলাল উদ্দিনের রামপুরের বাসভবনে যান।
সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় নেতাকর্মীরাও। কিন্তু আলাল তখন দেখা করেননি। ফোনে যোগাযোগের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।
এ ঘটনাও নতুন করে গুঞ্জন ছড়িয়েছে দলের ভেতরে এখনো অস্থিরতা কাটেনি।
ফেনীর তিন আসনে বিএনপির মনোনয়ন
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ফেনী জেলার তিনটি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে,
- ফেনী-১ আসনে: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া
- ফেনী-২ আসনে: বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক জয়নাল আবদীন ভিপি
- ফেনী-৩ আসনে: শিল্পপতি ও ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু
দলের অভ্যন্তরীণ এই প্রতিযোগিতা এখন পুরো জেলাজুড়ে আলোচনার শীর্ষে।
রাজনীতিতে নতুন এক প্রতিবাদের ধারা?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘রিভিউ আবেদন’ বলে কোনো সংস্কৃতি আগে শোনা যায়নি।
তবে আলাল উদ্দিন আলালের এই অভিনব পন্থা একধরনের রাজনৈতিক প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “এ ধরনের ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ নেতাদের আবেগ, প্রত্যাশা ও বঞ্চনার প্রকাশ ঘটায়। তবে এটি যেন দলীয় শৃঙ্খলার বাইরে না যায়।”
সবশেষে বলা যায়, আলাল উদ্দিন আলালের ধানক্ষেতের রিভিউ আবেদন শুধু একটি ছবি নয়,
এটি বর্তমান রাজনীতিতে দলের ভেতরের অস্থিরতা, প্রতিযোগিতা ও প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।








