হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
রবিবার, জুন ২৮, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeতথ্য প্রযুক্তিলাইক বাটন সরিয়ে দিচ্ছে ফেসবুক: ১৬ বছরের সমাপ্তি
spot_img

লাইক বাটন সরিয়ে দিচ্ছে ফেসবুক: ১৬ বছরের সমাপ্তি

অনলাইনে যোগাযোগের ইতিহাসে এমন কিছু প্রতীক আছে, যা মানুষ দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে খুব সহজেই এক হয়ে গেছে। ফেসবুকের লাইক বাটন ঠিক তেমনই একটি প্রতীক। মাত্র একটি ক্লিকেই প্রকাশ পেত ভালো লাগা, সমর্থন, প্রশংসা কিংবা অংশগ্রহণের মতো অনুভূতি। ২০০৯ সালে চালু হওয়া এই ছোট্ট নীল আইকনটি মানুষের ডিজিটাল আচরণই বদলে দিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে এনে দিয়েছিল নতুন ধারা। দীর্ঘ ১৬ বছর সেই লাইক বাটন কোটি মানুষের জীবনে ছাপ ফেলেছে। তবে এখন সেই পরিচিত ফিচার নিয়েই আসছে বড় পরিবর্তন।

মেটা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ফেসবুকের লাইক ও কমেন্ট বাটন ওয়েবসাইটে আর কাজ করবে না। অর্থাৎ অনলাইন পোর্টাল, নিউজ সাইট, ব্লগ, ই–কমার্স ওয়েবসাইট, ব্যক্তিগত পোর্টফোলিও কিংবা যেকোনো পেজে ফেসবুকের অফিশিয়াল লাইক ও কমেন্ট প্লাগইন থাকলে এগুলো আর ব্যবহারযোগ্য থাকবে না। বহু বছর ধরে যেসব ওয়েবসাইটে দর্শকরা সরাসরি ফেসবুকে লাইক দিতে পারতেন, সেগুলোর সুবিধা সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হবে।

অ্যাপ ও ওয়েবে লাইক থাকবে, তবে বাহিরে আর নয়

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফেসবুকের নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে লাইক বাটন বন্ধ হচ্ছে না। ব্যবহারকারীরা আগের মতোই নিজের ফেসবুক অ্যাপ, ওয়েব সংস্করণ বা ডেস্কটপ ভার্সনে পোস্ট, ছবি, রিল, ভিডিও, লাইভ কনটেন্ট বা রিলসে লাইক দিতে পারবেন। অর্থাৎ ফেসবুক নিজের প্ল্যাটফর্মে লাইক রাখছে, কিন্তু অন্যদের ওয়েবসাইটে এই ফিচার তুলে নিচ্ছে।

মেটা জানিয়েছে এটি তাদের ডেভেলপার টুলগুলোকে আধুনিক করার অংশ। বহু আগে তৈরি হওয়া এই প্লাগইনগুলো এখন আর ব্যবহারকারীদের প্রয়োজন মেটাচ্ছে না। বরং এগুলো আপডেট রাখা কষ্টকর হয়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলেছে, ব্যবহারকারীর চাহিদা বদলেছে, এবং গোপনীয়তা বিষয়ে কঠোর নীতি চালু হওয়ায় এসব পুরনো টুল আর আগের মতো প্রাসঙ্গিক নেই। তাই মেটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ওয়েবভিত্তিক লাইক ও কমেন্ট প্লাগইন সরিয়ে দেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে তারা আরও নতুন এবং নিরাপদ ফিচার তৈরি করতে পারে।

কেন এই পরিবর্তন আনছে মেটা?

ফেসবুক প্রথম যখন ওয়েবভিত্তিক লাইক বাটন চালু করে, তখন এটি ছিল এক বিপ্লব। অগণিত ওয়েবসাইটে লাইক বাটন যুক্ত থাকত, যা ফেসবুকে দর্শকের অংশগ্রহণ বাড়াত এবং কনটেন্টকে জনপ্রিয় করতে সাহায্য করত। অনেক ওয়েবসাইট ট্রাফিক বাড়াতে এই প্লাগইন ব্যবহার করত। এমনকি ব্র্যান্ড বা প্রতিষ্ঠানও এটিকে মার্কেটিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বানিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে ইন্টারনেটের পরিবেশ।

ফেসবুকের প্রভাব কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ নতুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থান। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব শর্টস, স্ন্যাপচ্যাট এসব প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা ফেসবুকের বাইরের প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ওয়েবসাইটে ফেসবুক লাইক বাটনের ব্যবহার হ্রাস পেয়েছে। যে প্লাগইন একসময় লাখো ওয়েবসাইটে ব্যবহৃত হতো, এখন তা খুব অল্প সংখ্যক সাইটেই সক্রিয়।

এর সঙ্গে আরও আছে কঠোর গোপনীয়তা আইন। ইউরোপের জিডিপিআর, ক্যালিফোর্নিয়ার ডেটা প্রাইভেসি আইনসহ বহু দেশে শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা আইনের কারণে ফেসবুককে ডেটা সংগ্রহের পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হচ্ছে। পুরনো প্লাগইনগুলো এসব আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এজন্য এগুলো আপডেট রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

মেটা বলছে, পুরনো ও অপ্রয়োজনীয় টুল ধরে রাখার কোনো মানে নেই। বরং এগুলো বাদ দিয়ে তারা ডেভেলপারদের জন্য নতুন টুল তৈরি করতে চায়। তাই ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির পর লাইক ও কমেন্ট প্লাগইন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে।

লাইক বাটন: শুধু প্রযুক্তি নয়, একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক

লাইক বাটন শুধু একটি ফিচার নয়, বরং এটি একসময় অনলাইন সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছিল। একটি পোস্ট কত জনপ্রিয়, একটি ছবি কত মানুষ দেখেছে, একটি ভিডিও কতটা ভাইরাল হচ্ছে এর মূল মাপকাঠি ছিল লাইক সংখ্যা। ব্র্যান্ড, প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম এমনকি ব্যক্তি পর্যায়েও লাইক ছিল এক ধরনের সামাজিক পরিচয়। অনেকেই বলতেন, “পোস্ট দিলাম, লাইক কই?”

২০০৯ সালে লাইক বাটনের জন্ম ছাড়াও ফেসবুক সেই সময় মানুষের যোগাযোগের ধরনেই পরিবর্তন এনেছিল। মন্তব্য না করে শুধু লাইক দিয়ে অনুভূতি জানানোর এই সুবিধা তখন ছিল অভিনব। কিন্তু ২০২৫ সালের ইন্টারনেট আর আগের মতো নেই। মানুষ এখন শুধু ফেসবুকে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নানা প্ল্যাটফর্মে সময় কাটাচ্ছে। অ্যালগরিদম এখন অনেক জটিল এবং ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা এখন প্রযুক্তি দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ফেসবুকও এখন পুরনো ধারা থেকে বের হয়ে নতুন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ও আধুনিক সিস্টেমে কাজ করতে চায়। ওয়েবভিত্তিক লাইক বাটন এই নতুন দুনিয়ার সঙ্গে আর মানানসই নয়। তাই এই ফিচারের সমাপ্তি সময়ের দাবি।

ওয়েবসাইট মালিক ও সংবাদমাধ্যমের ওপর এর প্রভাব কী?

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে ফেসবুক লাইক বাটন এখনো দেখা যায়। পাঠকরা একটি ক্লিকে ফেসবুকে গিয়ে নিউজটিতে লাইক দিতে পারতেন। এতে ওয়েবসাইটেও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ত, ফেসবুকে পোস্টের পৌঁছও বাড়ত। তবে নতুন সিদ্ধান্তে এসব ওয়েবসাইটকে অন্য বিকল্প ভাবতে হবে।

ফেসবুক আশা করছে, প্রকাশকেরা এখন তাদের কনটেন্ট প্রচারের জন্য শেয়ার বাটন ব্যবহার করবে, অথবা সরাসরি ফেসবুকে লিংক পোস্ট করবে। তবে ওয়েবভিত্তিক লাইক বাটন না থাকায় কনটেন্ট ভাইরাল হওয়ার আগের সেই সুবিধা আর থাকবে না।

সংবাদমাধ্যম ও ব্লগ সাইটের জন্য এটি এক ধরনের পরিবর্তন। তবে সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে সরাসরি অংশগ্রহণ এখন বেশি কার্যকর হওয়ায় অনেকেই মনে করছেন, এটি খুব বড় ক্ষতি হবে না।

ফেসবুকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং নতুন দিকনির্দেশনা

মেটা বলছে, তারা প্ল্যাটফর্মকে আরও আধুনিক করতে চায়। ভবিষ্যতে ফেসবুক আরও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক সুবিধা যুক্ত করবে, যেগুলো ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা উন্নত করবে। মেটাভার্স, এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট, রেকমেন্ডেশন অ্যালগরিদম এসব ক্ষেত্রে তারা বেশি মনোযোগ দিতে চায়।

পুরনো এবং কম ব্যবহৃত টুল বাদ দিয়ে নতুন প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া মেটার লক্ষ্য। তাই ফেসবুক লাইক প্লাগইন সরিয়ে নেওয়া তাদের নতুন যুগের প্রথম পদক্ষেপ।

১৬ বছরের যাত্রার অবসান, কিন্তু লাইক এখনো বেঁচে থাকবে

যদিও ওয়েবসাইট থেকে লাইক বাটন উঠিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তবে ফেসবুকের মূল প্ল্যাটফর্মে লাইক টিকে থাকবে। ব্যবহারকারীদের আচরণে লাইক এখনও গুরুত্বপূর্ণ। পোস্টের জনপ্রিয়তা মাপতে এটি এখনো কার্যকর। তাই লাইক ফেসবুকের জন্য একেবারে শেষ হয়ে যাচ্ছে না, বরং এটি শুধু নিজের পরিবেশে সীমাবদ্ধ থাকবে।

নতুন প্রযুক্তির দুনিয়ায় ফেসবুকও নতুনভাবে গড়ে উঠছে। আর এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই লাইক প্লাগইন বিদায় নিচ্ছে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img