২০২৬ সালে পাসপোর্ট তৈরির স্বপ্ন দেখছেন? আধুনিক ই-গেট সুবিধা আর শক্তিশালী নিরাপত্তা নিয়ে ই-পাসপোর্ট এখন আরও সহজলভ্য। ঘরে বসেই আবেদন থেকে শুরু করে দ্রুততম ডেলিভারি, সব আপডেট তথ্যে সাজানো আমাদের এই গাইড। দালালের ঝামেলা এড়িয়ে নির্ভুলভাবে পাসপোর্ট পেতে চাইলে ২০২৬ সালের এই নতুন নিয়মগুলো এখনই জেনে নিন!
ই-পাসপোর্ট পরিচিতি ও পটভূমি
ই-পাসপোর্ট কী?
এই ই-পাসপোর্ট বা ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট হলো একটি ডিজিটাল চিপযুক্ত পাসপোর্ট। এতে পাসপোর্ট ধারকের ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, আঙুলের ছাপ (Biometric) এবং চোখের মণি (Iris) স্ক্যান সংরক্ষিত থাকে। এটি প্রচলিত পাসপোর্টের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ।
ই-পাসপোর্ট ও এমআরপি (MRP) পাসপোর্টের পার্থক্য
- এমআরপি: এতে তথ্য শুধুমাত্র কাগজে ছাপা থাকে এবং একটি বারকোড থাকে। ইমিগ্রেশনে অফিসারকে ম্যানুয়ালি তথ্য চেক করতে হয়।
- ই-পাসপোর্ট: এতে একটি স্মার্ট চিপ থাকে। এয়ারপোর্টে ‘ই-গেট’ ব্যবহার করে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা যায়, কোনো অফিসারের মুখোমুখি না হয়েও।
বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট চালুর ইতিহাস
২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট সেবা উদ্বোধন করেন। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই প্রথম দেশ হিসেবে এই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
২০২৬ সালের নতুন আপডেট ও সরকারি নির্দেশনা
২০২৬ সালে ই-পাসপোর্ট সিস্টেমে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষ আরও সহজে পাসপোর্ট পেতে পারে।
- বায়োমেট্রিক ও নিরাপত্তা আপগ্রেড: এখন চিপের নিরাপত্তা স্তর আরও শক্তিশালী করা হয়েছে, যাতে জালিয়াতি করা অসম্ভব হয়।
- আবেদন প্রক্রিয়ায় নতুন সংযোজন: এখন থেকে এনআইডি (NID) সার্ভারের সাথে সরাসরি লিংকের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা হয়, যার ফলে ফরমে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে।
- অনলাইন পেমেন্ট: গেটওয়ে আরও উন্নত করা হয়েছে, এখন সব ধরণের মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, নগদ, রকেট) দিয়ে সহজেই ফি দেওয়া যায়।
ই-পাসপোর্ট করার যোগ্যতা ও শর্তাবলী
বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিক যার একটি বৈধ এনআইডি বা জন্ম নিবন্ধন সনদ (অনলাইন) আছে, তিনি ই-পাসপোর্ট করতে পারবেন।
- শিশু ও কিশোর: যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে, তাদের আবেদনপত্রের সাথে বাবা-মায়ের এনআইডি এবং অনলাইন জন্ম নিবন্ধন কপি প্রয়োজন হবে।
- শিক্ষার্থী: শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কোনো আলাদা নিয়ম নেই, তবে পেশার জায়গায় ‘Student’ উল্লেখ করতে হবে।
- সরকারি চাকরিজীবী: এনওসি (NOC) বা রিটায়ারমেন্ট ডকুমেন্ট (PRL) জমা দিলে তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাসপোর্ট পাবেন।
ই-পাসপোর্ট করতে কী কী লাগবে?
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
১. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সবার জন্য বাধ্যতামূলক।
২. অনলাইন জন্ম নিবন্ধন (BRC): যাদের বয়স ১৮ বছরের কম।
৩. আবেদন ফরমের সারসংক্ষেপ (Application Summary): অনলাইন আবেদনের পর প্রাপ্ত কপি।
৪. পেমেন্ট স্লিপ: ব্যাংক এশিয়া, ওয়ান ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক বা সোনালী ব্যাংকের টাকা জমা দেওয়ার রসিদ।
৫. পুরনো পাসপোর্ট (যদি থাকে): নবায়নের ক্ষেত্রে মূল পাসপোর্ট ও ফটোকপি।
পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে করণীয়:
যদি পাসপোর্ট হারিয়ে যায়, তবে নিকটস্থ থানায় জিডি (GD) করতে হবে এবং আবেদনের সময় জিডি কপির মূল কপি জমা দিতে হবে।
ই-পাসপোর্ট করার খরচ ২০২৬
ই-পাসপোর্টের ফি নির্ভর করে পাসপোর্টের পাতার সংখ্যা এবং মেয়াদের ওপর। (উল্লেখ্য: ভ্যাটসহ ফি কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে)।
| পাসপোর্টের ধরন | ৫ বছর মেয়াদী (ফি) | ১০ বছর মেয়াদী (ফি) |
| সাধারণ (২১ দিন) | ৪,০২৫ টাকা | ৫,৭৫০ টাকা |
| জরুরি (৭-১০ দিন) | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,০৫০ টাকা |
| অতি জরুরি (২ দিন) | ৮,৬২৫ টাকা | ১০,৩৫০ টাকা |
ই-পাসপোর্ট আবেদন করার নিয়ম ২০২৬
ক) অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া
১. ওয়েবসাইট: প্রথমে epassport.gov.bd সাইটে যান।
২. অ্যাকাউন্ট তৈরি: আপনার জেলা ও বর্তমান থানা নির্বাচন করে ইমেইল দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলুন।
৩. ফরম পূরণ: আপনার এনআইডি অনুযায়ী নাম, বাবা-মায়ের নাম, ঠিকানা ও পেশা সঠিকভাবে লিখুন।
৪. পাসপোর্টের ধরন নির্বাচন: ৪৮ পাতা বা ৬৪ পাতা এবং মেয়াদ পছন্দ করুন।
খ) অফলাইন কার্যক্রম ও বায়োমেট্রিক
অনলাইন আবেদন শেষে একটি তারিখ (Appointment) দেওয়া হবে। সেই তারিখে সকল মূল কাগজপত্রসহ পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত হতে হবে। সেখানে আপনার ছবি তোলা হবে এবং দশ আঙুলের ছাপ ও আইরিস স্ক্যান নেওয়া হবে।
ই-পাসপোর্ট পুলিশ ভেরিফিকেশন ২০২৬
বর্তমানে ই-পাসপোর্টের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত করা হয়।
- পুলিশ ভেরিফিকেশন কখন লাগে না: যদি আপনার স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা একই হয় এবং আগে পাসপোর্ট করা থাকে (নবায়ন), তবে সাধারণত ভেরিফিকেশন লাগে না।
- নতুন পাসপোর্ট: প্রথমবার পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে পুলিশ আপনার দেওয়া তথ্য যাচাই করতে আপনার বাড়িতে বা বর্তমান ঠিকানায় আসবে।
ই-পাসপোর্ট স্ট্যাটাস চেক ও ডেলিভারি
আবেদন করার পর আপনার পাসপোর্টের বর্তমান অবস্থা জানতে:
- ই-পাসপোর্ট অনলাইন চেক: ওয়েবসাইটে গিয়ে ‘Check Status’ অপশনে আপনার ‘Application ID’ ও জন্ম তারিখ দিন।
- ই-পাসপোর্ট SMS ট্র্যাকিং: মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে লিখুন:
ID <Application ID>এবং পাঠিয়ে দিন ১৬৪৪৫ নম্বরে।
ই-পাসপোর্ট করার সুবিধা
১. ই-গেট ব্যবহার: বিদেশ ভ্রমণের সময় লম্বা লাইনে না দাঁড়িয়ে ডিজিটাল গেট দিয়ে পার হওয়া যায়।
২. আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা: উন্নত দেশগুলোতে ই-পাসপোর্টধারীদের ভিসা পাওয়া সহজ হয়।
৩. নিরাপত্তা: এই পাসপোর্ট জাল করা অসম্ভব।
ই-পাসপোর্ট আবেদন করার সতর্কতা
- আবেদন ফরমে কোনো তথ্য গোপন করবেন না।
- দালাল চক্র থেকে দূরে থাকুন, নিজে অনলাইনে আবেদন করুন।
- এনআইডি কার্ডের তথ্যের সাথে পাসপোর্টের তথ্যের মিল থাকা বাধ্যতামূলক।
ই-পাসপোর্ট সম্পর্কিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: ই-পাসপোর্ট করতে কত টাকা লাগে?
উত্তর: ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, ৫ বছর মেয়াদী সাধারণ পাসপোর্টের ফি ৪,০২৫ টাকা এবং ১০ বছর মেয়াদী সাধারণ পাসপোর্টের ফি ৫,৭৫০ টাকা। জরুরি ও পাতার সংখ্যার ভিত্তিতে এই ফি বাড়তে পারে।
প্রশ্ন: ই-পাসপোর্ট করতে কি পুলিশ ভেরিফিকেশন লাগে?
উত্তর: নতুন ই-পাসপোর্টের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক। তবে পাসপোর্ট নবায়নের ক্ষেত্রে যদি তথ্যের কোনো পরিবর্তন না থাকে, তবে সাধারণত ভেরিফিকেশন প্রয়োজন হয় না।
প্রশ্ন: ই-পাসপোর্ট কত দিনে পাওয়া যায়?
উত্তর: সাধারণ ডেলিভারিতে ২১ কর্মদিবস, জরুরি ডেলিভারিতে ৭-১০ কর্মদিবস এবং অতি জরুরি (Express) ডেলিভারিতে ২ কর্মদিবসের মধ্যে পাসপোর্ট পাওয়া যায়।
প্রশ্ন: ১৮ বছরের নিচে শিশুদের পাসপোর্টের মেয়াদ কত বছর হয়?
উত্তর: ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য বর্তমানে শুধুমাত্র ৫ বছর মেয়াদী ই-পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়।
প্রশ্ন: এনআইডি কার্ড না থাকলে কি ই-পাসপোর্ট করা যাবে?
উত্তর: যাদের বয়স ১৮ বছরের বেশি তাদের জন্য এনআইডি বাধ্যতামূলক। ১৮ বছরের নিচে হলে অনলাইন জন্ম নিবন্ধন (BRC) দিয়ে আবেদন করা যাবে।
প্রশ্ন: ই-পাসপোর্ট ফি কোন কোন ব্যাংকে জমা দেওয়া যায়?
উত্তর: সোনালী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া এবং ঢাকা ব্যাংকে ফি জমা দেওয়া যায়। এ ছাড়া অনলাইন পেমেন্টও করা যায়।
প্রশ্ন: পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে নতুন করে ই-পাসপোর্ট করার নিয়ম কী?
উত্তর: প্রথমে নিকটস্থ থানায় একটি জিডি (GD) করতে হবে। এরপর অনলাইনে আবেদনের সময় ‘Lost Passport’ অপশন সিলেক্ট করে জিডি কপির স্ক্যান কপি আপলোড করতে হবে।
প্রশ্ন: ই-পাসপোর্টের জন্য ছবি কি বাসা থেকে নিয়ে যেতে হয়?
উত্তর: না, ই-পাসপোর্টের ছবি সরাসরি পাসপোর্ট অফিসে ডিজিটাল ক্যামেরায় তোলা হয়। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে ল্যাব প্রিন্ট করা ছবি সাথে রাখা ভালো।
প্রশ্ন: ভুল তথ্য সংশোধন করে ই-পাসপোর্ট করা যাবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, তবে তথ্যের বড় ধরণের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এনআইডি সংশোধন করে তারপর পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা বুদ্ধিমানের কাজ।
প্রশ্ন: ই-গেট (e-Gate) ব্যবহারের সুবিধা কী?
উত্তর: ই-গেট ব্যবহারের মাধ্যমে আপনি ইমিগ্রেশন অফিসারের সহায়তা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের পাসপোর্ট স্ক্যান করে সীমান্ত পার হতে পারবেন, যা সময় সাশ্রয়ী ও আধুনিক।








