বিশ্বজুড়ে দুর্নীতির পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা বার্লিনভিত্তিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) তাদের ২০২৫ সালের ‘দুর্নীতির ধারণাসূচক’ (CPI) প্রকাশ করেছে। এবারের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দুর্নীতি পরিস্থিতির একটি মিশ্র চিত্র ফুটে উঠেছে। ১৮২টি দেশের মধ্যে ১০০ স্কোরের মধ্যে মাত্র ২৪ পেয়ে বাংলাদেশ তালিকার ১৩তম অবস্থানে রয়েছে। গত বছরের তুলনায় অবস্থানে এক ধাপ উন্নতি হলেও দুর্নীতির ভয়াবহতা এখনো কাটেনি।
২০২৫ সালের সূচকে বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র
আজ মঙ্গলবার সকালে ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই প্রতিবেদন তুলে ধরে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় বাংলাদেশের স্কোর ১ পয়েন্ট বেড়েছে। গতবার বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৩, যা এবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪-এ।
স্বাভাবিকভাবে স্কোর বাড়লে অবস্থান পেছনের দিকে যায়। অর্থাৎ বাংলাদেশ গত বছর ১৪তম অবস্থানে থাকলেও এবার ১৩তম অবস্থানে উঠে এসেছে (নিচ থেকে গণনা করলে)। অন্যদিকে, ভালো দিক থেকে অর্থাৎ উচ্চক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৮২টি দেশের মধ্যে ১৫০তম।
কেন বাড়ল বাংলাদেশের স্কোর
টিআইবি তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, এ বছর স্কোরে যে ১ পয়েন্ট যোগ হয়েছে তার পেছনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে ‘জুলাই অভ্যুত্থান’। ছাত্র-জনতার এই আন্দোলনের ফলে দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা এবং জবাবদিহিমূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তনের প্রভাবে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কিছুটা উন্নত হয়েছে, যার প্রতিফলন ঘটেছে এই সূচকে।
তবে টিআইবি সতর্ক করে বলেছে, রাষ্ট্র সংস্কারের যে কাজগুলো বর্তমানে চলছে, তার পূর্ণ প্রতিফলন এই প্রতিবেদনে আসেনি। কারণ, রিপোর্টের তথ্য সংগ্রহের নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল। তাই আগামী বছরগুলোতে এই সংস্কারের প্রকৃত ফলাফল আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে।
বিশ্ব প্রেক্ষাপট: সবচেয়ে ভালো ও খারাপ দেশ
এবারের সূচকেও দেখা গেছে, কোনো দেশই ১০০-তে ১০০ স্কোর অর্জন করতে পারেনি। অর্থাৎ দুর্নীতিমুক্ত হওয়া একটি নিরন্তর লড়াই।
- সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত: ৮৯ স্কোর নিয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে ডেনমার্ক। তারা টানা কয়েক বছর ধরে স্বচ্ছতার দিক থেকে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে।
- সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত: মাত্র ৯ স্কোর নিয়ে তালিকার তলানিতে বা সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছে দক্ষিণ সুদান ও সোমালিয়া।
বৈশ্বিক দুর্নীতির উদ্বেগজনক বিস্তার
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে একটি ভয়ংকর তথ্য উঠে এসেছে বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এখন উচ্চমাত্রার দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোতে বসবাস করছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যেসব দেশ নিজেদের গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে, সেখানেও দুর্নীতির গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। দুর্নীতির এই বৈশ্বিক বিস্তার প্রমাণ করে যে, কেবল শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তন করলেই হয় না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশে দুর্নীতি কমানোর চ্যালেঞ্জসমূহ
টিআইবি মনে করে, রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ায় যতক্ষণ না পর্যন্ত দৃশ্যমান এবং টেকসই অগ্রগতি হচ্ছে, ততক্ষণ বাংলাদেশের স্কোর ও অবস্থানের বড় কোনো পরিবর্তন আশা করা কঠিন। দুর্নীতির এই চক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন:
১. শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
২. বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা।
৩. তথ্য অধিকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ।
৪. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
২০২৫ সালের দুর্নীতির ধারণাসূচক আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা কিছুটা এগোলেও পথের অনেকটা বাকি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন একটি স্বচ্ছ এবং দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছে। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে কাজে লাগিয়ে যদি সত্যিকারের রাষ্ট্র সংস্কার করা যায়, তবে আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ এই লজ্জাজনক তালিকা থেকে আরও দূরে সরে আসতে পারবে।








