রাজধানীর বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটিয়াদের দীর্ঘদিনের সমস্যা ও দ্বন্দ্ব নিরসনে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর সঠিক বাস্তবায়নে একটি নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। এই নির্দেশিকা অনুযায়ী, এখন থেকে চাইলেই হুট করে ভাড়া বাড়ানো যাবে না এবং নিরাপত্তার স্বার্থে ভাড়াটিয়াকে অবশ্যই ছাদ ও মূল গেটের চাবি দিতে হবে।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) গুলশানের নগর ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ এই নির্দেশিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন। আসুন জেনে নিই, এই নতুন নির্দেশিকায় বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের জন্য কী কী নিয়ম রাখা হয়েছে।
২ বছরের আগে ভাড়া বৃদ্ধিতে নিষেধাজ্ঞা
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, ভাড়া কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী ২ বছর পর্যন্ত কোনো অবস্থাতেই বাড়ি ভাড়া বাড়ানো যাবে না। অর্থাৎ, একবার ভাড়া ঠিক হলে তা দুই বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। দুই বছর পার হওয়ার পর বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে ভাড়া পুনর্নিধারণ করতে পারবেন।
তবে এক্ষেত্রেও একটি সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ভাড়া বাড়ানোর সময় এলাকার বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি বাড়ানো যাবে না। এছাড়া, ভাড়া বৃদ্ধির সময়কাল হতে হবে জুন বা জুলাই মাস। বছরের মাঝখানে বা অন্য কোনো সময়ে ভাড়া বাড়ানো যাবে না।
ছাদ ও গেটের চাবি ব্যবহারের অধিকার
শহরের অধিকাংশ বাড়িতেই ভাড়াটিয়াদের ছাদ ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না, যা নিয়ে প্রায়ই অসন্তোষ দেখা দেয়। ডিএনসিসির নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প বা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি এবং বিনোদনের অধিকার রক্ষায় বাড়িওয়ালা প্রত্যেক ভাড়াটিয়াকে ছাদ ও মূল গেটের চাবি শতভাগ প্রদান করবেন।
এছাড়া বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া উভয়ে মিলে বাড়ির ছাদ, বারান্দা ও সামনের খালি জায়গায় গাছ লাগাবেন বা সবুজায়ন করবেন।
ভাড়া প্রদান ও রসিদ সংগ্রহের নিয়ম
ভাড়া আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
- ভাড়া পরিশোধ: ভাড়াটিয়াকে প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ করতে হবে।
- রসিদ প্রদান: ভাড়া নেওয়ার সময় বাড়িওয়ালা অবশ্যই ভাড়াটিয়াকে ভাড়ার নির্দিষ্ট রসিদ দেবেন।
- প্রমাণপত্র: ভাড়াটিয়াকেও স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত রসিদ সংগ্রহ করে রাখতে হবে, যা ভবিষ্যতে যেকোনো আইনি জটিলতায় প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
অগ্রিম ভাড়া ও উচ্ছেদ নোটিশ
অনেকেই বাড়ি ভাড়ার সময় মোটা অঙ্কের অগ্রিম টাকা দাবি করেন। নতুন নিয়মে, ভাড়ার সময় ১ থেকে ৩ মাসের ভাড়ার সমপরিমাণের বেশি অগ্রিম টাকা নেওয়া যাবে না।
এছাড়া, চাইলেই ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করা যাবে না। যদি কোনো ভাড়াটিয়া নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়া দিতে ব্যর্থ হন, তবে বাড়িওয়ালা প্রথমে মৌখিকভাবে সতর্ক করবেন। এরপরও ভাড়া না দিলে সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ২ মাসের মধ্যে বাড়ি ছাড়ার লিখিত নোটিশ দিতে হবে। একইভাবে, আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষ চুক্তি বাতিল করতে চাইলে ২ মাসের নোটিশ দিতে হবে।
বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার অন্যান্য দায়িত্ব
বাড়িওয়ালার দায়িত্ব হলো বাড়িটি বসবাসের উপযোগী রাখা। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি বা ইউটিলিটি সার্ভিসের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ এবং প্রতিদিনের ময়লা বা বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে, ভাড়াটিয়ার নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় বাড়িওয়ালা কোনো পদক্ষেপ নিলে তা ভাড়াটিয়াকে জানাতে হবে এবং সম্মতি নিতে হবে। যেকোনো সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
বিরোধ নিষ্পত্তিতে ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটি
নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিটি ওয়ার্ডে ‘বাড়িওয়ালা সমিতি’ এবং ‘ভাড়াটিয়া সমিতি’ গঠন করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে ভাড়া নির্ধারণ বা যেকোনো সমস্যা সমাধানে এই দুই সমিতির প্রতিনিধিরা কাজ করবেন। যদি স্থানীয়ভাবে সমাধান না হয়, তবে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করা হবে।
ডিএনসিসির এই উদ্যোগ বাড়িভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য কমাতে এবং উভয় পক্ষের অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।








