আমাদের স্বপ্নের শহর, আমাদের প্রিয় ঢাকা। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ এই শহরে জীবিকার খোঁজে আসে। কিন্তু এই শহরটি কি আসলেই আমাদের থাকার জন্য নিরাপদ বা আরামদায়ক? সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক নামী প্রতিষ্ঠান ‘ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ (EIU) ২০২৬ সালের একটি নতুন রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। আর এই রিপোর্টে আমাদের ঢাকার এক অত্যন্ত দুঃখজনক ছবি সামনে এসেছে। বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য বা বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা ৩য় স্থান পেয়েছে।
আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা করব কেন ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে এবং কোন কোন বিষয়ে আমাদের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ।
ইআইইউ (EIU) রিপোর্ট ২০২৬: ঢাকার অবস্থান ঠিক কোথায়?
প্রতি বছরই বিশ্বজুড়ে শহরগুলোর জীবনযাত্রার মান নিয়ে একটি তালিকা তৈরি করা হয়। ২০২৬ সালের এই বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে মোট ১৭৩টি শহরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এই বিশাল তালিকার একদম নিচের দিকে ১৭১তম স্থানে রয়েছে ঢাকা।
এই তালিকায় ঢাকার নিচে রয়েছে কেবল দুটি শহর যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক এবং লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি। অর্থাৎ, কোনো যুদ্ধ বা বড় ধরনের সামরিক সংঘাত না থাকা সত্ত্বেও ঢাকা শহরের অবস্থা প্রায় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের শহরগুলোর মতোই খারাপ।
স্কোর কীভাবে দেওয়া হয়?
এই সূচকটি তৈরি করা হয় ১ থেকে ১০০ স্কোরের ওপর ভিত্তি করে। নিয়ম অনুযায়ী:
- স্কোর ৮০-এর ওপরে হলে সেই শহরকে বসবাসের জন্য চমৎকার বা গ্রহণযোগ্য বলা হয়।
- স্কোর ৪০-এর নিচে হলে সেই শহরকে অসহনীয় বা একেবারেই বসবাসের অযোগ্য ধরা হয়।
২০২৬ সালের রিপোর্টে ঢাকার মোট স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৪২। এর মানে হলো, আমাদের ঢাকা শহর অসহনীয় হওয়ার সীমানা থেকে মাত্র ২ পয়েন্ট ওপরে আছে। যেকোনো সময় এটি আরও খারাপের দিকে চলে যেতে পারে। যেখানে ১৭১তম স্থানে থাকা ঢাকার স্কোর ৪২, সেখানে ১৭২তম স্থানে থাকা ত্রিপোলির স্কোর ৪১ এবং সবার শেষে থাকা দামেস্কের স্কোর ৩২।
যে ৫টি কারণে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হচ্ছে
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট মূলত ৫টি মূল বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এই তালিকা তৈরি করে। এই ৫টি খাতের প্রতিটিতেই ঢাকার স্কোর খুবই হতাশাজনক। নিচে এই বিষয়গুলো সহজভাবে তুলে ধরা হলো:
১. অবকাঠামো (স্কোর: মাত্র ২৭)
ঢাকার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর অবকাঠামো। এই খাতে ঢাকার স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৭, যা ঢাকার সব স্কোরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
- ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট এবং অন্তহীন যানজট।
- গণপরিবহন বা বাসের নিম্নমানের অবস্থা।
- গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট।
- দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, যার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট ডুবে যায়।
২. সংস্কৃতি ও পরিবেশ (স্কোর: ৪১)
একটি শহরের পরিবেশ মানুষের মন ও শরীর ভালো রাখে। কিন্তু এই খাতে ঢাকার স্কোর মাত্র ৪১। এর কারণগুলো হলো:
- অতিরিক্ত বায়ুদূষণ এবং চারপাশের ময়লা-আবর্জনা।
- মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তোলে।
- বিনোদন, খেলাধুলা বা পার্কের চরম অভাব।
- তীব্র গরম এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব।
৩. স্বাস্থ্যসেবা (স্কোর: ৪২)
অসুখ-বিসুখে মানুষ যেখানে চিকিৎসা নেবে, সেই স্বাস্থ্য খাতের অবস্থাও ভালো নয়। স্বাস্থ্যসেবায় ঢাকার স্কোর ৪২।
- সরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত ভিড় এবং সঠিক চিকিৎসার অভাব।
- বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার আকাশছোঁয়া খরচ।
- নকল ও ভেজাল ওষুধের ভয় এবং সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার নিম্নমান।
৪. স্থায়িত্ব বা নিরাপত্তা (স্কোর: ৪৫)
একটি শহরে শান্তিতে বাস করার জন্য নিরাপত্তা সবচেয়ে জরুরি। এই খাতে ঢাকার স্কোর ৪৫।
- ছোটখাটো চুরি, ছিনতাই এবং সহিংস অপরাধের ভয়।
- সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বা হুটহাট আন্দোলনের ঝুঁকি।
- সাধারণ মানুষের মনের ভেতর এক ধরণের নিরাপত্তাহীনতা।
৫. শিক্ষা (স্কোর: ৬৭)
ঢাকার জন্য একমাত্র স্বস্তির জায়গা হলো শিক্ষা খাত। এই খাতে ঢাকার স্কোর ৬৭, যা অন্য সব খাতের চেয়ে অনেক বেশি। ঢাকাতে ভালো ভালো স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তবে শিক্ষার পরিবেশ এবং সরকারি-বেসরকারি শিক্ষার মানের মধ্যে এখনো অনেক বড় ব্যবধান রয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ ও ভালো শহরের তালিকা
এই রিপোর্টে ঢাকার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশের শহরগুলোর অবস্থাও তুলে ধরা হয়েছে। চলুন এক নজরে দেখে নিই বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ এবং সবচেয়ে ভালো ১০টি শহরের নাম।
বসবাসের অযোগ্য শীর্ষ ১০টি শহর:
১. দামেস্ক (সিরিয়া) – সবচেয়ে খারাপ
২. ত্রিপোলি (লিবিয়া)
৩. ঢাকা (বাংলাদেশ)
৪. করাচি (পাকিস্তান)
৫. আলজিয়ার্স (আলজেরিয়া)
৬. লাগোস (নাইজেরিয়া)
৭. পোর্ট মোর্সবি (পাপুয়া নিউগিনি)
৮. কিয়েভ (ইউক্রেন)
৯. হারারে (জিম্বাবুয়ে)
১০. তেহরান (ইরান)
বসবাসের জন্য সেরা ১০টি শহর:
১. কোপেনহেগেন (ডেনমার্ক) – বিশ্বের সেরা শহর
২. ভিয়েনা (অস্ট্রিয়া)
৩. মেলবোর্ন (অস্ট্রেলিয়া)
৪. সিডনি (অস্ট্রেলিয়া)
৫. জুরিখ (সুইজারল্যান্ড)
৬. জেনেভা (সুইজারল্যান্ড)
৭. ওসাকা (জাপান)
৮. অ্যাডিলেড (অস্ট্রেলিয়া)
৯. ভ্যাঙ্কুভার (কানাডা)
১০. টোকিও (জাপান)
এই অবস্থা থেকে বাঁচার উপায় কী?
ঢাকা বসবাসের অযোগ্য—এই তকমা থেকে মুক্ত হতে হলে আমাদের এখনই কিছু বড় পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকার এবং জনগণ সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।
- যানজট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন: গণপরিবহনের মান বাড়াতে হবে এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে মানতে হবে।
- পরিবেশ রক্ষা: বায়ুদূষণ ও প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে। শহরের খাল ও নদীগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে।
- চিকিৎসা ও সেবার মান বাড়ানো: সাধারণ মানুষের জন্য কম খরচে ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
- পরিকল্পিত নগরায়ণ: ঢাকার ওপর মানুষের চাপ কমাতে অন্যান্য জেলা শহরের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।
ঢাকা আমাদের প্রাণ। এই শহরকে বাঁচাতে হলে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।








