আজকের দিনে ‘আমেরিকা’ মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বিশাল সব বহুতল ভবন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, সিলিকন ভ্যালি আর শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। কিন্তু ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, এক শতাব্দী আগে আমেরিকার মানুষের মূল পেশা ছিল কৃষি। তৎকালীন সময়ে দেশটির প্রায় ৯৫ ভাগ মানুষ কৃষিকাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করত।
তাহলে একটি সাধারণ কৃষিনির্ভর দেশ কীভাবে সময়ের ব্যবধানে সারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনীতির রাষ্ট্রে পরিণত হলো? তাদের এই শক্তিশালী অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির মূল ভিত্তি কিসের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পাশাপাশি আমাদের দেখতে হবে, একই রকম কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক অর্থনীতির দৌড়ে কোথায় অবস্থান করছে।
আমেরিকার অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল চাবিকাঠি কী ছিল?
আমেরিকা কিন্তু কৃষিকে অবহেলা করে শিল্পায়নের দিকে যায়নি, বরং কৃষিকে হাতিয়ার করেই তারা উন্নত দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। তাদের এই সফলতার পেছনে প্রধান কয়েকটি কারণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. কৃষিতে প্রযুক্তি ও রসায়নের ব্যবহার
আমেরিকার অর্থনীতির রূপান্তরটা তখনই ঘটেছিল, যখন তারা কৃষিতে ব্যাপক পুঁজি বা বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করে। জমিতে সনাতন পদ্ধতির বদলে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষি রসায়নের (যেমন উন্নত সার ও কীটনাশক) উদ্ভাবন তাদের কৃষি উৎপাদনকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একেই বলা যায় তাদের অর্থনীতির মূল টার্নিং পয়েন্ট।
২. কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিকীকরণ
আমেরিকা শুধু ফসল উৎপাদন করেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা শুরু করেছিল কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন। কৃষকের ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপকরণ, বীজ ও যন্ত্রপাতি তৈরিতে তারা জোর দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নত গবেষণা ও নতুন প্রযুক্তিকে সরাসরি মাঠে প্রয়োগ করা হয়। এরপর উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও প্রযুক্তিকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়ে তারা নিজেদের বাণিজ্যিকীকরণ মজবুত করে।
৩. মেধাবী অভিবাসী নীতি ও মেধাস্বত্ব আইন
আমেরিকার বড় একটি শক্তি হলো তাদের অভিবাসন নীতি। তারা সারা পৃথিবী থেকে সেরা মেধাবীদের নিজেদের দেশে নিয়ে আসে এবং তাদের দিয়ে গবেষণা ও নতুন নতুন আবিষ্কার করায়। এরপর ‘মেধাস্বত্ব আইন’ বা পেটেন্ট রাইটসের মাধ্যমে সেই আবিষ্কারের ওপর নিজেদের একচ্ছত্র মনোপলি বা বাণিজ্য সুবিধা তৈরি করে সারা বিশ্বে পুঁজির বিস্তার ঘটায়। তাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো পুঁজিবাদ ও উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট: আমরা কোথায় আছি?
এবার যদি আমরা আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাব আমাদের চিত্রটা কিছুটা আলাদা হলেও সম্ভাবনাময়। বাংলাদেশেও এখনো দেশের জিডিপিতে (GDP) একক খাত হিসেবে কৃষি অত্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তবে সময়ের সাথে সাথে আমাদের দেশে শিল্প খাত এবং সেবা খাতও বেশ সম্প্রসারিত হয়েছে।
কিন্তু মুদ্রার ওপিঠ হলো, দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনো মূলত কৃষি শ্রমিক বা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি পেশার সাথেই জড়িত। আমেরিকার মতো আমাদের কৃষি খাত এখনো সেই স্তরে পৌঁছাতে পারেনি যেখানে এটি পুরো দেশের অর্থনীতিকে একাই টেনে নিয়ে যাবে।
মার্কিন মডেল ও বাংলাদেশের করণীয়: আমাদের যা করা উচিত
বাংলাদেশকে যদি বিশ্বের বুকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়, তবে উন্নত দেশের বিশেষ করে আমেরিকার এই অর্থনৈতিক রূপান্তরের মডেলটি অনুসরণ করা যেতে পারে। আমাদের দেশের কৃষকদের ভাগ্য ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে হলে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
- কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির বিনিয়োগ: আমাদের দেশের কৃষিতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। ড্রোন প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় সেচ ব্যবস্থা এবং আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
- বাজার ব্যবস্থাপনার সংস্কার: কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য পান, সেজন্য মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের দৌরাত্ম্য কমাতে হবে এবং সরাসরি বাজারজাতকরণের আধুনিক সংস্কার প্রয়োজন।
- গবেষণা ও সম্প্রসারণের সমন্বয়: দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা শুধু ল্যাবরেটরিতে আটকে না রেখে তা সরাসরি মাঠপর্যায়ে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কৃষি শিক্ষা, গবেষণা ও সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাজের গতি ও গুরুত্ব আরও বাড়াতে হবে।
আমেরিকার ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, কৃষি কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটিই হতে পারে একটি দেশের উন্নত অর্থনীতিতে যাওয়ার সবচেয়ে বড় সিঁড়ি। বাংলাদেশ যদি তার বিশাল জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করে কৃষিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঠিক ছোঁয়া দিতে পারে, তবে আমাদের দেশও একদিন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক দেশে পরিণত হতে পারবে।








