বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েটর’ পরিচয়ে অনেকেরই অবাধ বিচরণ। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, অনুমতি ছাড়াই সাধারণ মানুষের ভিডিও ধারণ করে তা ‘রসালো শিরোনামে’ প্রচার করা হচ্ছে, যা জনজীবনে চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অস্থিরতা থামাতে সরকার ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ এর আওতায় কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
যা বললেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, অনুমতি ছাড়া কারো ভিডিও ধারণ করে প্রচার করা অপরাধ। নতুন এই আইন অনুযায়ী, অভিযোগ পাওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬: অপরাধ ও দণ্ড
মন্ত্রী জানান, গত ১০ এপ্রিল সংসদে পাস হওয়া এই আইনের ২৫ নম্বর ধারায় এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে:
- সাধারণ অপরাধ: ইচ্ছাকৃতভাবে ব্ল্যাকমেইলিং, হয়রানি বা ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে ভিডিও প্রচার করলে অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
- নারী ও শিশু ভুক্তভোগী হলে: অপরাধের শিকার ব্যক্তি নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু হলে শাস্তি বেড়ে ৫ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
- চাঁদা দাবি: অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ করে চাঁদা দাবি করলে তা ‘সাইবার স্পেসে প্রতারণা’ হিসেবে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
প্রযুক্তিগত ও আইনি ব্যবস্থা
সরকার এই অপরাধ দমনে বেশ কিছু যুগান্তকারী প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে:
১. তৎক্ষণাৎ কন্টেন্ট ব্লক: জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মহাপরিচালক যেকোনো ক্ষতিকর কন্টেন্ট তাৎক্ষণিকভাবে অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষমতা রাখেন।
২. ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব: অপরাধীর পরিচয়, ভিডিওর উৎস ও ব্যবহৃত ডিভাইস শনাক্ত করতে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা হচ্ছে।
৩. রিয়েল-টাইম মনিটরিং: ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার’ এবং কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম সাইবার স্পেসে এই ধরনের অপরাধ রিয়েল-টাইমে শনাক্ত করবে।
৪. পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার: ধারা ৩৫ অনুযায়ী, জরুরি প্রয়োজনে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, সরঞ্জাম জব্দ ও অপরাধীকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
নতুন আইনে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কন্টেন্ট ব্লক বা অপসারণের পর ৩ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া, বিদেশ থেকে পরিচালিত বা সীমান্ত পেরিয়ে সংঘটিত সাইবার অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক পারস্পরিক সহায়তা আইন, ২০১২ প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম আশা প্রকাশ করেন যে, এই কঠোর আইনি কাঠামো কার্যকর হলে সাইবার স্পেসে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ভিডিও ধারণ ও প্রচারের প্রবণতা অনেকাংশেই কমে আসবে।








