ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে এক ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। রাজধানী নয়াদিল্লিতে গৃহকর্মীর কাজ করা সীমা দাসের মতো লাখো ভোটারের মন পরিবর্তনের মাধ্যমেই মূলত ধসে পড়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপরাজেয় দুর্গ। সোমবারের নির্বাচনী ফলাফল ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।
মোদি ম্যাজিকে ধসে পড়ল তৃণমূলের দুর্গ
প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি ২০০টিতে জয়ী হয়ে অভাবনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে চলেছে। যেখানে ২০২১ সালে বিজেপি মাত্র ৭৭টি আসন পেয়েছিল, সেখানে এবার তাদের এই লম্ফপ্রদান রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও চমকে দিয়েছে। অন্যদিকে, মমতার তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৮৭টি আসনে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি রাজ্যের নির্বাচন নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে মোদি-বিরোধী জোটের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার মতো একটি ফলাফল।
জয়ের নেপথ্যে প্রধান ৩টি কারণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের মতে, বিজেপির এই অভাবনীয় জয়ের পেছনে তিনটি প্রধান প্রভাবক কাজ করেছে:
১. তীব্র ধর্মীয় মেরুকরণ ও ‘তোষণ’ রাজনীতি
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘মুসলিম তোষণ’-এর অভিযোগ করে আসছিল। তৃণমূলের আদর্শিক অবস্থান যাই হোক না কেন, সাধারণ হিন্দু ভোটারদের একটি বড় অংশের মধ্যে এই ধারণা গেঁথে দিতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। সীমা দাসের মতো ভোটাররা মনে করছেন, মমতা কেবল একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় ব্যস্ত। এই মেরুকরণই হিন্দুদের ভোটকে একাট্টা করেছে।
২. প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া ও স্থানীয় ক্ষোভ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিগতভাবে জনপ্রিয় হলেও তৃণমূলের তৃণমূল পর্যায়ের সাংগঠনিক কাঠামোর বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছিল। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দলীয় কর্মীদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং দুর্নীতির অভিযোগগুলো মানুষের মনকে বিষিয়ে তুলেছিল। বিশ্লেষক প্রবীণ রাইয়ের মতে, তৃণমূল ভোটারদের “নতুন কিছু দিতে পারেনি”।
৩. সুশৃঙ্খল নির্বাচনী কৌশল ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি
বিজেপি এবার অনেক বেশি পরিকল্পিত প্রচারণা চালিয়েছে। এছাড়া ২ হাজার ৪০০ কোম্পানি আধা-সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি তৃণমূলের স্থানীয় সাংগঠনিক প্রভাবকে অনেকটাই স্তিমিত করে দিয়েছিল। এতে দোদুল্যমান ভোটাররা নির্ভয়ে তাদের মত পরিবর্তন করতে পেরেছেন।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক
এবারের নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায় ছিল ভোটার তালিকা সংশোধন। ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৯০ লাখ মানুষকে তালিকা থেকে বাদ দেয়। তৃণমূলের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে মুসলিম ভোটারদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। মমতা একে “অসাংবিধানিক” বলে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করলেও নির্বাচনের ফলে এর বড় প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গের এই পরাজয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জাতীয় রাজনীতিতে মোদির বিকল্প হয়ে ওঠার স্বপ্নকে বড় ধাক্কা দিল। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে মোদি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে যে চাপে ছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের এই জয় সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে তাকে সহায়তা করবে। এই জয় মোদির নেতৃত্বকে জাতীয় পর্যায়ে আরও সুদৃঢ় ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলল।
হাল ছাড়ছেন না মমতা
নির্বাচনী বিপর্যয় সত্ত্বেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহজে মাঠ ছাড়ার পাত্রী নন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি কর্মীদের ‘বাঘের বাচ্চার মতো’ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে তার দল দমনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষক নীলাঞ্জন সরকারের মতে, এই ফলাফলের পর পশ্চিমবঙ্গে বড় ধরনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং সংঘাতের শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। বিজেপির এই জয় যেমন ঐতিহাসিক, তেমনি পশ্চিমবঙ্গের আগামীর রাজনীতি হতে চলেছে অত্যন্ত উত্তপ্ত।








