বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলাদেশেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে। তবে এই মূল্যবৃদ্ধির মাঝেও একটি বড় শ্রেণির গ্রাহকের জন্য সুখবর রয়েছে।
কেন বাড়ছে বিদ্যুতের দাম
মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণেই এই দাম সমন্বয়ের কথা ভাবছে সরকার। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে পরিমাণ খরচ হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক কম দামে গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করা হয়। এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করতে এবং সরকারি ভর্তুকির ওপর চাপ কমাতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দাম বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে।
লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য সুখবর
পিডিবির প্রস্তাবনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘লাইফলাইন’ গ্রাহক। লাইফলাইন গ্রাহক বলা হয় তাদের, যারা মাসে ৭৫ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন।
- অপরিবর্তিত দাম: প্রস্তাব অনুযায়ী, লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না। অর্থাৎ নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর সরাসরি কোনো বাড়তি চাপ পড়বে না।
- বড় সুবিধাভোগী: দেশে মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় ৬৩ শতাংশই এই লাইফলাইন ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। ফলে দাম বাড়লেও দেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিলে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
কত শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে?
পিডিবি তাদের প্রস্তাবে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর অনুরোধ করেছে। বর্তমানের গড় খুচরা মূল্য ৮ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে বেড়ে ইউনিটে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। অন্যদিকে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে।
এক নজরে প্রস্তাবিত মূল্য পরিবর্তনের চিত্র:
| ধাপ | বর্তমান দাম (প্রতি ইউনিট) | প্রস্তাবিত বৃদ্ধি |
| পাইকারি পর্যায় | ৭ টাকা ৪ পয়সা | ১.২০ – ১.৫০ টাকা |
| খুচরা পর্যায় (গড়) | ৮ টাকা ৯৫ পয়সা | সর্বোচ্চ ১.৩৮ টাকা |
| সঞ্চালন চার্জ | – | ১৬ পয়সা (প্রতি ইউনিটে) |
বিইআরসি এবং কারিগরি কমিটির পদক্ষেপ
পিডিবির এই প্রস্তাব পাওয়ার পর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ইতোমধ্যে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি প্রস্তাবের যৌক্তিকতা যাচাই করে দেখবে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন যে, নিয়ম অনুযায়ী প্রস্তাবের ওপর একটি গণশুনানি হবে। যেখানে সাধারণ গ্রাহক, ব্যবসায়ী ও অংশীজনদের মতামত নেওয়া হবে।
কবে নাগাদ কার্যকর হতে পারে নতুন দাম
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামী ঈদুল আজহার আগে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম। তবে কারিগরি কমিটির মূল্যায়ন এবং গণশুনানি শেষ হওয়ার পর জুন মাস থেকেই নতুন দাম কার্যকর করার আভাস পাওয়া গেছে। এর আগে সব বিতরণ সংস্থা (যেমন নেসকো, ডিপিডিসি) তাদের নিজস্ব প্রস্তাব জমা দিলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সাধারণ গ্রাহকদের ওপর এর প্রভাব
যদিও ৬৩ শতাংশ গ্রাহক দাম বৃদ্ধির আওতার বাইরে থাকছেন, তবে বাকি ৩৭ শতাংশ গ্রাহক যারা মাসে ৭৫ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের বিল উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত এবং শিল্প কলকারখানার মালিকদের জন্য এটি বাড়তি খরচের কারণ হতে পারে। পিডিবির মতে, যারা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের ওপর বাড়তি দামের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে ভর্তুকি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
সবশেষ দাম বাড়ানো হয়েছিল যখন
এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল। সেই সময় পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ এবং খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ৮ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করা হয়। তার আগে কয়েক দফায় ছোট ছোট পরিমাণে দাম বাড়িয়ে সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছিল।
বিদ্যুতের দাম বাড়া সবসময়ই সাধারণ মানুষের জন্য চিন্তার বিষয়। তবে এবারের প্রস্তাবে নিম্ন আয়ের মানুষদের সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা প্রশংসনীয়। এখন দেখার বিষয়, বিইআরসির গণশুনানির পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হয়। নিয়মিত এমন আপডেট পেতে আমাদের নিউজ পোর্টালের সাথেই থাকুন।








