বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় গুরুত্ব ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হচ্ছে পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা। দিবসটি উপলক্ষে আজ বুধবার (১২ আগস্ট) দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এটি সরকারিভাবে কোনো সাধারণ ছুটি নয়, বরং ঐচ্ছিক ছুটির আওতায় এটি পালন করা হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বার্ষিক ছুটির তালিকা অনুযায়ী, এই দিনে এক দিনের ছুটি নির্ধারিত রয়েছে। ফলে সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত থাকবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিশেষ নোটিশ
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যেই আখেরি চাহার সোম্বা উপলক্ষে ছুটি সংক্রান্ত নিজস্ব নোটিশ জারি করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষ প্রশাসনিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এই ছুটির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, আখেরি চাহার সোম্বা উপলক্ষে বুধবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস এবং এর অধীনে থাকা সারা দেশের সকল অধিভুক্ত কলেজ পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।
আখেরি চাহার সোম্বা শব্দের সহজ অর্থ কী?
‘আখেরি চাহার সোম্বা’ শব্দটি মূলত আরবি ও ফারসি ভাষার একটি সমন্বিত রূপ। সহজ ভাষায় এর অর্থ বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়:
- আখেরি: ফারসি শব্দ, যার অর্থ ‘শেষ’।
- চাহার: ফারসি শব্দ, যার অর্থ ‘চতুর্থ’ বা এখানে সফর মাসের কথা নির্দেশ করা হয়েছে।
- সোম্বা: ফারসি শব্দ, যার অর্থ ‘বুধবার’।
অর্থাৎ পুরো বাক্যের বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘সফর মাসের শেষ বুধবার’। ইসলামিক হিজরি ক্যালেন্ডারের সফর মাসের শেষ বুধবারে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাময়িক সুস্থতা লাভকে স্মরণ করে বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশ দিনটি উদযাপন করে থাকেন।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও তাৎপর্য
ইরান, ইরাক, ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে আখেরি চাহার সোম্বা একটি বিশেষ ধর্মীয় দিন হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। ইসলামি ইতিহাস অনুযায়ী, ওফাতের বা মৃত্যুর আনুমানিক পাঁচ দিন আগে এক বুধবারে মহানবী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শরীরের তাপমাত্রা ও মাথাব্যথা ভীষণ বেড়ে যায়। অসুস্থতার কারণে তিনি বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন।
পরবর্তী সময়ে তাঁর মাথায় ঠান্ডা পানি ঢালা হলে তিনি কিছুটা সুস্থ বোধ করেন। এরপর তিনি মসজিদে নববীতে গিয়ে জোহরের সালাত আদায় করেন এবং সমবেত সাহাবিদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশমূলক ভাষণ দেন। প্রিয় নবীর কিছুটা সুস্থতার খবরে সাহাবিদের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে সফর মাসের শেষ বুধবারে এই দিবস পালনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
ইসলামিক শরীয়ত ও আলেমদের মতামত
আখেরি চাহার সোম্বা কেন্দ্র করে সমাজে নানা ধরনের আমল ও রীতি প্রচলিত থাকলেও এ বিষয়ে ইসলামি গবেষক ও বিশিষ্ট আলেমদের স্পষ্ট মতামত রয়েছে। আলেমদের মতে, সাহাবিদের যুগে বা ইসলামের প্রাথমিক যুগে বিশেষভাবে গোসল করা, নির্দিষ্ট কোনো নফল নামাজ পড়া কিংবা ঘটা করে এই দিন উদযাপন করার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি ছিল না।
ধর্মীয় বিশ্লেষক ও আলেমদের বক্তব্য অনুযায়ী:
- বিশেষ কোনো নফল আমল নেই: এদিন নির্দিষ্ট কোনো নিয়মে গোসল করা বা দুই রাকাত বিশেষ শোকরানা নামাজ আদায়ের আলাদা কোনো বাধ্যবাধকতা ইসলামে নেই।
- অতিরিক্ত প্রথা এড়ানো: বিভিন্ন স্থান বা দরবারে বিশেষ মিলাদ মাহফিল ও দান-খয়রাত করার কড়াকড়ি বিধান শরীয়তে নির্ধারিত নয়।
- নিয়মিত ইবাদত: যেকোনো দিনই সাধারণ জিকির-আজকার, ওয়াজ-নসিহত ও দোয়া করা উত্তম, তবে একে বিশেষ কোনো দিবসের সাথে নির্দিষ্ট করে নেওয়া বাধ্যবাধকতার অংশ নয়।
আজকের দিনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে পরিবার ও স্বজনদের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন। দিনটির ইতিহাস ও তাৎপর্য সঠিকভাবে জানার পাশাপাশি অনাবশ্যক প্রথা এড়িয়ে চলুন এবং ইবাদত-বন্দেগির সঠিক নিয়ম অনুসরণ করুন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত যেকোনো পরবর্তী আপডেট বা ছুটির খবর দ্রুত পেতে আমাদের সংবাদ পোর্টালে চোখ রাখুন।








