বিশ্ব হার্ট দিবসে সতর্কবার্তা: তরুণ বয়সেই বাড়ছে হৃদরোগের ঝুঁকি
আজ ২৯ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব হার্ট দিবস, এবারের প্রতিপাদ্য- ‘একটিও স্পন্দন যেন না হারায়’। বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হচ্ছে হৃদরোগ প্রতিরোধ ও সচেতনতার বার্তা নিয়ে।
বাংলাদেশে হৃদরোগ এখন একটি নীরব ঘাতক। বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর আড়াই লক্ষাধিক মানুষ মারা যাচ্ছেন হৃদরোগে। দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৪ শতাংশই ঘটে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে। বিশ্বব্যাপী এই হার প্রায় ৩৩ শতাংশ।
তরুণদের ঝুঁকি বাড়ছে
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মহসিন আহমদ এ বিষয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো তরুণদের মধ্যে দ্রুত বাড়ছে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি। বিশেষ করে ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে।”
তিনি জানান, “সম্প্রতি মাত্র ৩০–৪০ বছরের দুই তরুণ মারা গেছেন হার্ট অ্যাটাকে। অথচ উন্নত দেশগুলোতে এ বয়সে এমন ঘটনা খুবই কম। বাংলাদেশে এখন এই বয়সী তরুণরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।”
হার্ট অ্যাটাকের কারণ কী?
ডা. মহসিন বলেন, “আমাদের দেশে আর্থসামাজিক উন্নয়ন হলেও বায়ুদূষণ ভয়াবহভাবে বেড়েছে। ধূমপান, তামাকজাত দ্রব্য ও মাদক গ্রহণ বাড়ছে। এগুলো হৃদরোগ বৃদ্ধির প্রধান কারণ।”
তার মতে, তরুণরা প্রতিদিন কর্মব্যস্ত থাকলেও শরীরের সংকেতকে উপেক্ষা করছেন। অতিরিক্ত পরিশ্রমে ক্লান্তি, বুকে ব্যথা বা ধড়ফড়কে তারা সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাচ্ছেন। অথচ এগুলোই মারাত্মক সতর্কবার্তা।
সাম্প্রতিক কয়েকটি উদাহরণ
ডা. মহসিন উল্লেখ করেন-
- সাংবাদিক তারিকুল ইসলাম শিবলি ৯ সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহকালে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।
- ১১ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌস ভোটের কাজ করার সময় অজ্ঞান হয়ে যান। তিনিও হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যান।
তাদের বয়স ছিল মাত্র ৩০–৪০-এর মধ্যে। দুজনেই সক্রিয়, কর্মক্ষম ও প্রতিষ্ঠিত মানুষ ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, “ক্রিকেটার তামিম ইকবালও মাঠে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু সতীর্থরা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় তিনি বেঁচে যান। সময়মতো পদক্ষেপ নিলে অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব।”
প্রতিটি স্পন্দন মূল্যবান
বিশ্ব হার্ট দিবসের স্লোগান- ‘ডোন্ট মিস ইউর বিট’ (Don’t miss your beat)।
অধ্যাপক মহসিন বলেন, “হার্টের প্রতিটি স্পন্দন গুরুত্বপূর্ণ। যারা মারা গেছেন তারা কোনো না কোনো বিট মিস করেছেন। তামিম বেঁচে গেছেন কারণ তিনি সেই বিট মিস করেননি।”
শরীর আগেই সংকেত দেয়
তিনি জোর দিয়ে বলেন, “হঠাৎ মৃত্যু বলে কিছু নেই। শরীর আগেই সংকেত দেয়। কিন্তু আমরা তা উপেক্ষা করি। পরিশ্রমে অতিরিক্ত ক্লান্তি, বুকে চাপ, অস্বাভাবিক ধড়ফড়-এসবকে হেলাফেলা করা উচিত নয়।”
ডা. মহসিনের পরামর্শ, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে হবে। নিয়মিত হাঁটা, স্বাস্থ্যকর খাবার, ধূমপান ও মাদক বর্জন, এবং মানসিক চাপ কমানোই হতে পারে হৃদরোগ প্রতিরোধের পথ।
কেন সচেতনতা জরুরি
বাংলাদেশে এখন কর্মজীবী তরুণরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে পরিবার, সমাজ ও দেশের অর্থনীতি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন- “যুব সমাজই দেশের ভবিষ্যৎ। তারা যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে তবে উন্নয়নের ধারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
উপসংহার
বিশ্ব হার্ট দিবসে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদরোগ প্রতিরোধ সম্ভব। শুধু প্রয়োজন সচেতনতা ও সতর্ক জীবনযাপন। শরীরের সংকেত উপেক্ষা করলে যে কোনো সময় হতে পারে মৃত্যুঝুঁকি। তাই প্রতিটি স্পন্দন রক্ষা করতে হবে।








