ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি এক চরম উত্তেজনাকর মোড় নিয়েছে। একদিকে দেশটির ভেতরে চলছে ভয়াবহ সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, আর অন্যদিকে আমেরিকার সাথে চলছে পাল্টাপাল্টি যুদ্ধের হুমকি। অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন সহিংস রূপ নিয়েছে, যার ফলে প্রাণ গেছে শত শত মানুষের। এর মাঝেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির কড়া জবাব দিয়েছে তেহরান।
আজকের প্রতিবেদনে আমরা জানাবো ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি, আমেরিকার অবস্থান এবং যুদ্ধের প্রস্তুতির সবশেষ খবর।
বিক্ষোভে উত্তাল ইরান: নিহত ৬৫০
ইরানে মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে সাধারণ ব্যবসায়ীরা যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, তা এখন ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ (IHRNGO)-এর তথ্যমতে, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে এবং সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৫০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী ৯ জন শিশুও রয়েছে।
অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীরাও সরকারি স্থাপনা, নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যালয় এবং মসজিদে নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর শতাধিক সদস্য নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, রাজধানী তেহরান থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন ৩১টি প্রদেশের ১৮৬টি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় প্রায় ১০,৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আমেরিকার হুমকি ও ইরানের যুদ্ধের প্রস্তুতি
ইরানের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চাপ বাড়াচ্ছে আমেরিকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, তার হাতে “খুব শক্তিশালী বিকল্প” রয়েছে এবং তিনি ইরানের বিরোধী নেতাদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন। আমেরিকার দাবি, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
তবে আমেরিকার এই হুমকির মুখে বিন্দুমাত্র দমে যায়নি ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বিদেশি কূটনীতিকদের সাথে এক বৈঠকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
কী বলছে ইরান সরকার?
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত খুঁজছেন বলেই এই বিক্ষোভকে সহিংস করে তোলা হচ্ছে। তিনি বলেন:
“আমরা যুদ্ধের জন্য যেমন প্রস্তুত, তেমনি আলোচনার টেবিলে বসতেও প্রস্তুত। কিন্তু দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”
তেহরান দাবি করছে, সপ্তাহান্তে সহিংসতা বাড়লেও বর্তমানে পরিস্থিতি তাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে গতকাল রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন প্রদেশে লাখ লাখ মানুষ সরকারের সমর্থনে রাস্তায় নেমে মিছিল করেছেন।
আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া: দুই মেরুতে বিশ্ব
ইরান ইস্যুতে বিশ্বনেতারা এখন দুই ভাগে বিভক্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিচ্ছে। ইইউর মুখপাত্র আনোয়ার এল আনুনি জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের কারণে তারা আরও কঠিন পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
অন্যদিকে, কঠিন এই সময়ে ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী। বেইজিং সকল পক্ষকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
বিক্ষোভ দমাতে ইরান সরকার সাময়িকভাবে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় শিগগিরই ইন্টারনেট সেবা পুনরায় চালু করা হবে। এছাড়া সুইজারল্যান্ডের মধ্যস্থতায় আমেরিকার সাথে ইরানের যোগাযোগের পথ এখনো খোলা রয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
একদিকে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর অন্যদিকে আমেরিকার সামরিক হামলার হুমকি সব মিলিয়ে ইরান এখন এক কঠিন সময় পার করছে। তেহরান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বললেও, সাধারণ মানুষ চাইছে শান্তি এবং স্থিতিশীলতা।








