ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কোটি কোটি টাকার পণ্য পুড়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট সাত ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও, এর আগেই গুদামে থাকা প্রায় সব মালামালই ভস্মীভূত হয়েছে।
শনিবার দুপুরে লাগা এই আগুন শুধু দেশের প্রধান বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বিপর্যয় ঘটায়নি, বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংশ্লিষ্টরা।
আগুন লাগার সূত্রপাত ও দেরির অভিযোগ
বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আগুনের সূত্রপাত দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস আগুনের খবর পায় ২টা ৩০ মিনিটে, প্রথম গাড়ি পৌঁছে ২টা ৫০ মিনিটে। অর্থাৎ আগুন লাগার ৩৫ মিনিট পরও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু হয়নি।
যদিও বিমানবন্দরে বেবিচকের নিজস্ব ফায়ার ইউনিট রয়েছে, যারা তৎক্ষণাৎ পৌঁছানোর কথা, কিন্তু তারাও দেরি করেছে বলে অভিযোগ।
কার্গো কমপ্লেক্সে কর্মরত সিঅ্যান্ডএফ (C&F) এজেন্টদের দাবি, ফায়ার সার্ভিস আসার আগেই আগুন অনেকখানি ছড়িয়ে পড়ে। রাসায়নিক থাকার আশঙ্কায় ফায়ার সার্ভিস সরাসরি পানি ব্যবহার না করে অপেক্ষা করতে থাকে, ফলে আগুন আরও বেড়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
এ ওয়ান গ্রুপের পরিচালক ইমরান হোসাইন বলেন, “আগুন প্রথমে ডিএইচএল কুরিয়ারের খাঁচা থেকে শুরু হয়। কিন্তু যখন লোকজন নেভাতে যায়, তাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বলা হয় ভেতরে রাসায়নিক ও বিস্ফোরক থাকতে পারে।”
অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহেদ কামাল জানিয়েছেন, বাতাসের প্রবলতার কারণে আগুন নিভানো যাচ্ছিলো না । “এটি খোলা জায়গা, বাতাসে অক্সিজেন বেশি থাকায় আগুন জ্বলতে থাকে।”
বিশাল গুদাম, বিপুল ক্ষতি
বিমানবন্দরের উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত আমদানি গুদামটি প্রায় ১৪ লাখ বর্গফুট জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। এখানে বিভিন্ন সংস্থা আলাদা খোপে কুরিয়ার ও আমদানি পণ্য রাখে।
বেশ কয়েকটি সিঅ্যান্ডএফ কোম্পানি জানিয়েছে, তাদের কোটি কোটি টাকার পণ্য কাপড়, প্লাস্টিক, ফ্যাব্রিক, ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও কেমিকেল সব পুড়ে গেছে।
ফাস্ট অ্যান্ড সেইফ লজিস্টিকসের কর্মকর্তা আব্দুল মোমিন বলেন, “আমাদের চামড়া, ফ্যাব্রিক, সুতা ও ইলাস্টিক পণ ছিল। সবই পুড়ে গেছে।”
ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন
বিমানবন্দরে আমদানি করা প্রতিটি পণ্যের জন্য ব্যবসায়ীরা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার বিমানের কাছে নির্দিষ্ট চার্জ দেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে এই ক্ষতির দায় নেবে কে?
সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল আলম ভুইয়া বলেন, “আমরা চার্জ দিই, কিন্তু যখন ক্ষতি হয় তখন কেউ দায়িত্ব নেয় না। শত শত কোটি টাকার ক্ষতির দায় কে নেবে, এখন সেটাই প্রশ্ন।”
ইমরান হোসাইন আরও বলেন, “আমার কিছু মাল বীমা করা আছে, কিন্তু সেটা ৬ হাজার ডলার পর্যন্ত কভার করবে। অথচ ক্ষতি হয়েছে কোটি টাকার।”
তদন্ত ও সরকারি উদ্যোগ
অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে দুটি সরকারি কমিটি গঠন করা হয়েছে, একটি বিমান মন্ত্রণালয়, অন্যটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)।
আইআরডি কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে, আর বিমানের কমিটিকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, “বিমানের কার্গো পরিচালককে ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব তৈরি করতে বলা হয়েছে। খুব শিগগিরই তা হাতে আসবে।”
নাশকতা না দুর্ঘটনা?
অগ্নিকাণ্ডের পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এটি কি দুর্ঘটনা, নাকি নাশকতা?
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও তদন্ত দাবি করেছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এখনো কোনো নাশকতার প্রমাণ মেলেনি।
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, “যদি নাশকতা প্রমাণিত হয়, সরকার তাৎক্ষণিক কঠোর পদক্ষেপ নেবে। নাগরিকদের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।”
এই ভয়াবহ আগুন প্রশ্ন তুলেছে দায়িত্বশীলতা ও প্রস্তুতির ওপরও।
প্রতি বছর যে বিমানবন্দরে মহড়া হয়, সেখানে বাস্তব অগ্নিকাণ্ডে এমন বিপর্যয়, এটি আমাদের অব্যবস্থার নগ্ন উদাহরণ।
এখন ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ, সবাই অপেক্ষায়, কে দেবে ক্ষতিপূরণ? আর কবে এই অবহেলার আগুন নিভবে সত্যিকার অর্থে?








