দেশের বাজারে পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন ও অকটেনের দাম লিটারে একলাফে ২০ টাকা করে বাড়ানোর দিনেই বিশ্ববাজারে দেখা গেছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এক সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতনের মাধ্যমে এই নতুন রেকর্ড তৈরি হয়। মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের আশা এবং প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ সৌদি আরবের তেল রপ্তানি আংশিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর খবরেই বিশ্ববাজারে এই প্রভাব পড়েছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দরপতন ঠিক কতটা?
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বাংলাদেশ সময় সকাল আটটার দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দুই প্রধান বেঞ্চমার্কেই বড় দরপতন দেখা যায়:
- ব্রেন্ট ক্রুড (Brent Crude): আন্তর্জাতিক বাজারে এই তেলের দাম ব্যারেলে ২.১৬ ডলার বা ২.০৮ শতাংশ কমে যায়। দরপতনের পর প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দাঁড়িয়েছে ১০১.৭১ ডলার। উল্লেখ্য, দিনের শুরুতে এটি ১০ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল।
- ডব্লিউটিআই ক্রুড (WTI Crude): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট তেলের দাম ব্যারেলে ২.১৫ ডলার বা ২.১৪ শতাংশ কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৯৮.১৫ ডলারে।
যে দুই কারণে বিশ্ববাজারে কমছে তেলের দাম
আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নজর রাখা অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, মূলত দুটি প্রধান কারণ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে এই স্বস্তি এনে দিয়েছে:
১. যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক উদ্যোগ
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দিতে চলতি সপ্তাহে একটি নতুন কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সংবাদের কারণে বাজারে তেলের ওপর থাকা ‘ঝুঁকির প্রিমিয়াম’ বা অতিরিক্ত চাপ কমে এসেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চরম উত্তেজনার মধ্যেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসতে আগ্রহী। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে চলতি সপ্তাহে নিউইয়র্কে যাওয়ার কথা রয়েছে পেজেশকিয়ানের। এই সফরকে কেন্দ্র করেই ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
২. সৌদি আরবের তেল রপ্তানি স্বাভাবিক হওয়ার পথে
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হামলার কারণে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছিল। তবে দেশটি দ্রুত পরিস্থিতি সামলে উঠে সমুদ্রপথে তেল রপ্তানি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
- রপ্তানি বৃদ্ধি: জাহাজের গতিবিধি তদারককারী সংস্থা কেপলারের (Kpler) তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে সৌদি আরবের দৈনিক তেল রপ্তানি কমে ২৪ লাখ ব্যারেলে নেমেছিল। তবে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে দৈনিক ৪০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি হয়েছে।
- হরমুজ প্রণালির ব্যবহার: হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে আরামকো বিকল্প উপায়ে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে তেল পরিবহন বাড়িয়ে দিয়েছে। জেপি মরগানের বিশ্লেষকদের মতে, গত ছয় দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদির প্রতিদিন গড় তেল পরিবহন দাঁড়িয়েছে ২৯ লাখ ব্যারেলে, যা আগস্টে ছিল মাত্র ৭ লাখ ব্যারেল।
বিপরীত চিত্র বাংলাদেশে: লিটারে বাড়লো ২০ টাকা
আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতনের খবর আসলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও জাহাজ ভাড়া (Freight Charge) বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টার পর থেকে (অর্থাৎ ২১ সেপ্টেম্বর কার্যকর) ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের এই নতুন বর্ধিত দাম কার্যকর করা হয়েছে।
বিশ্ববাজারের এমন অস্থিরতা ও একই দিনে ঘরোয়া বাজারে দাম বৃদ্ধির ফলে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কূটনৈতিক আলোচনার পর বিশ্ববাজারের এই নিম্নমুখী ধারা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে দেশীয় বাজারেও তার প্রভাব পড়ে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।








