সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের মানসিক বিকাশে কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। তবে এবার বিষয়টি শুধু আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, গড়িয়েছে আদালতের এজলাসে। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ধ্বংস করা এবং গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াসহ ৩০টি অঙ্গরাজ্য।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালতে বিচারক ইভন গনজালেস রজার্সের এজলাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মামলার জুরি ট্রায়াল বা বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। মামলায় মেটার বিরুদ্ধে ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্যের শিশু সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সাথে ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলারেরও বেশি জরিমানা দাবি করা হয়েছে।
মামলার মূল অভিযোগ: কীভাবে শিশুদের আসক্ত করছে মেটা?
বাদিপক্ষের দাবি, মেটার মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রাম এবং ফেসবুকের অ্যালগরিদম ও ভেতরের ডিজাইন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা শিশু ও তরুণদের অ্যাপের পর্দায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখে। সাধারণ ভাষায় বলতে গেলে, এটি শিশুদের মানসিকভাবে আসক্ত করে তোলে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কোম্পানিটি জেনেশুনেই এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে যা অপ্রাপ্তবয়স্কদের কৌতূহল ও মানসিক দুর্বলতাকে কাজে লাগায়। এর ফলে শিশুদের স্বাভাবিক ঘুম, পড়াশোনা এবং সামাজিক জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
প্ল্যাটফর্মে যেসব পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়েছে
৩০টি অঙ্গরাজ্যের আইনজীবীরা যৌথভাবে আদালতের কাছে মেটার প্ল্যাটফর্মগুলোতে মৌলিক ও স্থায়ী পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের উল্লেখযোগ্য দাবিগুলো হলো:
- ইনফিনিট স্ক্রোল বন্ধ করা: অ্যাপের স্ক্রিন নিচে নামাতে থাকলে যেন কনটেন্ট আসা শেষ না হয়, সেই ফিচারটি বন্ধ করা।
- লাইক গণনা বন্ধ রাখা: কতজন লাইক দিল তা দেখার প্রবণতা শিশুদের মধ্যে হীনমন্যতা তৈরি করে, তাই এটি বন্ধের দাবি।
- ভিডিওর স্বয়ংক্রিয় প্লেব্যাক রোধ: একটি ভিডিও শেষ হলে নিজে থেকেই অন্য ভিডিও চালু হওয়া আটকানো।
- অবাস্তব ইমেজ ফিল্টার বাদ দেওয়া: যেসব ফিল্টার ব্যবহার করে রূপ বা চেহারার কাল্পনিক পরিবর্তন করা হয়, সেগুলো শিশুদের মনে ভুল ধারণা তৈরি করে।
- ইনস্টাগ্রাম স্টোরিজ বাতিল: নির্দিষ্ট সময় পর যেসব কনটেন্ট মুছে যায়, সেগুলোর অপব্যবহার রোধে তা বন্ধের প্রস্তাব।
- অভিভাবকদের যাচাইকরণ: অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের জন্য অভিভাবকদের অনুমতি বা যাচাইকরণ প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করা।
অভিযোগের বিপরীতে কী বলছে মেটা?
শুরু থেকেই মেটা তাদের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা তরুণ ব্যবহারকারীদের নিরাপদে রাখার জন্য দীর্ঘকাল ধরে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তারা আদালতের শুনানিতে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করবেন।
মেটার দাবি, তারা কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষার জন্য ইতিমধ্যেই বেশ কিছু নতুন ফিচার যুক্ত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে দৈনিক সময় বেঁধে দেওয়ার সুবিধা এবং প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অপশন।
নিউ মেক্সিকোর রায় ও মেটার ভবিষ্যৎ সংকট
মেটার জন্য সাম্প্রতিক সময়টা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। এর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর একটি আদালত মেটাকে ৯৪২ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে ‘জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর’ হিসেবে উল্লেখ করে।
প্রযুক্তি ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যালিফোর্নিয়ার এই ৩০টি অঙ্গরাজ্যের যৌথ মামলায় যদি মেটা হেরে যায়, তবে তা শুধু মেটার আর্থিক ক্ষতিই করবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের সম্পূর্ণ ধরনে এক বৈপ্লবিক ও স্থায়ী পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
শিশুদের সুরক্ষা ও সোশ্যাল মিডিয়ার ভবিষ্যৎ
এই মামলাটি বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দায়িত্বশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। প্রযুক্তির এই যুগে শিশুদের কীভাবে নিরাপদ রাখা যায় এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে কীভাবে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা যায়, তা এখন বিশ্বনেতাদের চিন্তার বিষয়। ক্যালিফোর্নিয়ার আদালতের এই রায় আগামী দিনে শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতে এক নতুন ইতিহাস তৈরি করতে পারে।








