হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
Wednesday, August 12, 2026
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeজাতীয়দেশজুড়ে লোডশেডিং বাড়ছে কেন? জেনে নিন চরম বিদ্যুৎ সংকটের আসল ৩ কারণ
spot_img

দেশজুড়ে লোডশেডিং বাড়ছে কেন? জেনে নিন চরম বিদ্যুৎ সংকটের আসল ৩ কারণ

দেশজুড়ে অসহ্য গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখন মারাত্মকভাবে ব্যাহত। শহরের মানুষ তবুও কিছুটা সামলে নিচ্ছেন, কিন্তু গ্রামের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। দেশের বহু অঞ্চলে দিনের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সময়ই আলো জ্বলছে না। স্থানভেদে টানা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার লোডশেডিং সামলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং বিদ্যুৎ সরবরাহকারী বিভিন্ন কোম্পানির দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিদ্যুতের এই ভয়াবহ সংকটের নেপথ্যে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয় দায়ী নয়। মূলত তিনটি বড় সমস্যার কারণে সারা দেশ আজ অন্ধকারের কবলে পড়েছে।

১. গ্যাস ও কয়লার তীব্র ঘাটতি

বিদ্যুৎ না থাকার সবচেয়ে বড় কারণ হলো জ্বালানি সংকট। আমাদের দেশের বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র চলে গ্যাস এবং কয়লা দিয়ে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চাহিদামতো এই দুটি জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না।

গ্যাসের সরবরাহ হ্রাস

বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে দিনে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়। অথচ পিডিবি সরবরাহ পাচ্ছে মাত্র ৭০ কোটি ঘনফুট। ফলে শুধু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেই দৈনিক অন্তত ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপন্ন হচ্ছে। দেশে গ্যাস দিয়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও এখন পাওয়া যাচ্ছে গড়ে মাত্র সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেহাল দশা

একই চিত্র দেখা যাচ্ছে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতেও। প্রয়োজনীয় কয়লার অভাবে মাতারবাড়ী, পায়রা, রামপাল, এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার এবং বড়পুকুরিয়ার মতো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন অনেক কমে গেছে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়লা সংকটের কারণে ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও, খরচ বেশি হওয়ায় ধাপে ধাপে মাত্র ২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।

২. ভারত থেকে আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়া

গ্যাস ও কয়লা সংকটের পাশাপাশি লোডশেডিং বাড়ার দ্বিতীয় বড় কারণ হলো ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি হঠাৎ কমে যাওয়া। ভারত থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আসার কথা, তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ আমদানি

চুক্তি অনুযায়ী ভারতের আদানি গ্রুপ থেকে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১,৪৯৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে। গত কয়েকদিন ধরে পিক আওয়ারে তারা মাত্র ৮১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাঠাতে পেরেছে।

আদানির বিদ্যুৎ কম আসার কারণ

পিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে বলে আদানি গ্রুপ থেকে দাবি করা হয়েছে। কয়লার মজুত কমে যাওয়ার কারণে তারা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। তবে আদানির দেওয়া এই অজুহাত কতটা সত্য, তা পিডিবি নিশ্চিত হতে পারেনি। আদানি ছাড়া আন্তর্জাতিক অন্যান্য জটিলতার কারণেও আমদানি প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।

৩. বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা

উৎপাদন ঘাটতির সাথে তৃতীয় যে বিষয়টি লোডশেডিংয়ের জন্য দায়ী, তা হলো আমাদের দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার পুরানো কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ নানা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি।

বিতরণ সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব

বিভিন্ন এলাকা পর্যালোচনা করে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর নিজেদের অভ্যন্তরীণ মতভেদের কারণে অনেক সময় সাধারণ গ্রাহকরা অতিরিক্ত ভোগান্তির শিকার হন। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে একটিমাত্র সমন্বিত বিতরণ ব্যবস্থা থাকলে অপ্রয়োজনীয় লোডশেডিং অন্তত ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

কারিগরি ত্রুটি ও ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ঘটনা

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি (LNG) টার্মিনালে দুর্ঘটনা ঘটে। টার্মিনালে আগুন লাগার কারণে দৈনিক ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাবে শিল্পকারখানার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনও এক ধাক্কায় অনেক নেমে যায়। ওই টার্মিনালটি মেরামতের পর পুনরায় কাজ শুরু করলেও পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে সময় লাগছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জাতীয় গ্রিডে।

সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও সার্বিক চিত্র

জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের (পিজিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা যেখানে দিনে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি, সেখানে সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে মাত্র ১২ থেকে ১৩ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রতিদিন ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুতের বড় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

এই ঘাটতি মেটাতে গিয়ে পিডিবি এবং অন্যান্য বিতরণ কোম্পানিগুলো এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ আসার সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি না থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য, বাসাবাড়ির দৈনন্দিন কাজ এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গরম যত বাড়বে, এই সংকট সামাল দেওয়া তত কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!