মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান তীব্র সংঘাতের মধ্যেই এক ঐতিহাসিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হলো বিশ্ব। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ তিন মুসলিম পরাশক্তি—সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান একটি ঐতিহাসিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরোধ চুক্তি’ (Mecca Joint Defense Pact) নামে এই বিশেষ সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের একক নিয়ন্ত্রণে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য এই চুক্তিটি এক নতুন এবং বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে যাচ্ছে।
চুক্তির মূল ধারা: ‘একজনের ওপর হামলা, সবার ওপর হামলা’
এই প্রতিরক্ষা চুক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ন্যাটোর (NATO) ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো সম্মিলিত সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি। চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী—তিনটি দেশের যেকোনো একটির ওপর কোনো বহিরাগত সশস্ত্র হামলা হলে, সেটিকে বাকি দুই দেশের ওপরও হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বহুদিনের গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্ববোধ, কৌশলগত স্বার্থ এবং যৌথ নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যেই এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর লক্ষ্য কেবল নিজেদের রক্ষা করাই নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখা।
তিন দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির মহাজোট
নতুন এই অক্ষ বা জোটের মাধ্যমে তিন দেশের আলাদা কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী সামর্থ্যকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা হলো:
- তুরস্ক: আধুনিক প্রতিরক্ষা শিল্পে আত্মনির্ভরশীল এবং ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনীর অধিকারী।
- সৌদি আরব: বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক ও অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু।
- পাকিস্তান: বিশ্ব মানচিত্রে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী (Nuclear Power) রাষ্ট্র।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি, সৌদির বিপুল অর্থ এবং পাকিস্তানের কৌশলগত পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা (Nuclear Deterrence) এক হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এক বিশাল নতুন নিরাপত্তা শক্তির জন্ম দিয়েছে।
ওয়াশিংটনের জন্য এটি কেন বড় উদ্বেগের কারণ?
কয়েক দশক ধরে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর নিরাপত্তার প্রধান ভরসা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি। তবে সম্প্রতি ইরানের সাথে সংঘাত, মার্কিননীতির অস্থিরতা এবং ইসরায়েলকে একতরফা সমর্থনের কারণে ওয়াশিংটনের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতায় ফাটল ধরেছে।
রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার ইনস্টিটিউটের গবেষক ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিখসেনের মতে, “আঞ্চলিক দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে নিজেদের সুরক্ষায় শুধু আমেরিকার ওপর নির্ভর করে বসে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তারা বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদারত্ব তৈরি করছে।”
এই চুক্তিটি ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা এখন আর শুধুই আমেরিকার আদেশের অপেক্ষায় থাকবে না; বরং নিজেদের স্বনির্ভর কৌশলগত পথ নিজেরাই তৈরি করবে।
ইসরায়েল ও ইরানের প্রতিক্রিয়া ও বার্তা
চুক্তিটি সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে ঘোষণা করা না হলেও এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম:
- ইসরায়েলের ওপর চাপ: গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের কঠোর বিরোধী তুরস্ক ও পাকিস্তান। নতুন এই জোট মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের অনিয়ন্ত্রিত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সামরিক ভারসাম্য (Balance of Power) তৈরি করবে।
- ইরান ঘিরে সতর্কতা: ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলা নিয়ে তিন দেশেরই সুনির্দিষ্ট উদ্বেগ ছিল। এই চুক্তি ইরানের ওপরও পরোক্ষ মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করবে।
নতুন এক নিরাপত্তা কাঠামোর সূচনা
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির অন্যতম শীর্ষ নীতিনির্ধারক ব্রেট ম্যাকগার্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিখেছেন, “মক্কা চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য আজ এক নতুন ও পরিবর্তনশীল বাস্তবতার যুগে প্রবেশ করল।”
যদিও এটি রাতারাতি যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করবে না, তবে এটি নিশ্চিত যে সৌদি আরব ও তার সহযোগীরা এখন ওয়াশিংটনের ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা কমাবে। ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’র মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় যে নতুন সমীকরণ শুরু হলো, তা আগামী দিনে বৈশ্বিক রাজনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক একক আধিপত্যের দিন যে ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে, মক্কার এই জোট তারই স্পষ্ট বার্তা। নিজ নিজ স্বার্থ ও প্রতিরক্ষা সুরক্ষিত করতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর এই জোটবদ্ধ হওয়া বিশ্ব রাজনীতির এক নতুন মাইলফলক।








