ফলের রাজা আম পছন্দ করেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। গ্রীষ্মকাল বা জ্যৈষ্ঠ মাস আসার সাথে সাথেই বাজারে এখন বিভিন্ন জাতের সুস্বাদু ও মিষ্টি আমের ছয়লাপ দেখা যায়। ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ফজলি থেকে শুরু করে হাড়িভাঙা হরেক রকমের আমের গন্ধে চারপাশ ম ম করে। ছোট থেকে বড়, প্রায় সব বয়সের মানুষই এই ফল খেতে ভীষণ ভালবাসেন। তবে আম খাওয়ার পর আমরা সাধারণত একটি কাজই করি, আর তা হলো আমের আঁটিটি সোজা ডাস্টবিনে ফেলে দিই। কিন্তু আপনি কি জানেন? আমরা যে আমের আঁটিটিকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে ফেলে দিচ্ছি, তার ভেতরের অংশ দিয়েও অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর তরকারি রান্না করা যেতে পারে!
গ্রামাঞ্চলে বা পুরোনো দিনের রান্নায় এই রেসিপির বেশ প্রচলন রয়েছে। এটি যেমন খেতে দারুণ, তেমনি এর রয়েছে অনেক পুষ্টিগুণ। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা জানবো কীভাবে খুব সহজে আমের আঁটি দিয়ে জিভে জল আনা তরকারি তৈরি করা যায়।
আমের আঁটির ভেতরের শাঁসের পুষ্টিগুণ
খাদ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মতে, আমের আঁটির ভেতরে যে নরম সাদা রঙের শাঁস বা অংশ থাকে, তাতে বেশ কিছু উপকারী পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এগুলো আমাদের শরীরের জন্য বেশ উপকারী:
- হজমে সাহায্য করে: আমের আঁটির শাঁসে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা আঁশ থাকে। এই ফাইবার আমাদের পেটের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং হজম প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ ও উন্নত করতে সাহায্য করে।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়: এতে বেশ কিছু শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট পাওয়া যায়। এই অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টগুলো আমাদের শরীরকে বিভিন্ন রকমের ক্ষতিকর উপাদানের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে দারুণ কাজ করে।
তরকারি রান্নার প্রয়োজনীয় উপকরণ
আমের আঁটি দিয়ে এই চমৎকার তরকারিটি বা চচ্চড়ি তৈরি করতে আপনার রান্নাঘরে থাকা সাধারণ কিছু উপকরণের প্রয়োজন হবে। উপকরণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- আমের আঁটির ভেতরের শাঁস: ৪ থেকে ৫টি
- আলু: ২টি (ছোট ছোট কিউব বা চৌকো করে কাটা)
- বেগুন: ১টি (আলুর মাপে কাটা)
- সর্ষের তেল: ২ টেবিল চামচ
- কালোজিরে: আধ (১/২) চা চামচ
- শুকনো লঙ্কা বা মরিচ: ২টি
- হলুদ গুঁড়ো: ১ চা চামচ
- লঙ্কার গুঁড়ো বা মরিচ গুঁড়ো: আধ (১/২) চা চামচ
- নুন বা লবণ: আপনার স্বাদমতো
- চিনি: আধ (১/২) চা চামচ (স্বাদ ব্যালেন্স করার জন্য)
- কাঁচা লঙ্কা: ২টি (মাঝখান থেকে চিরে নেওয়া)
- জল বা পানি: পরিমাণমতো
- ধনেপাতা কুচি: সামান্য (ওপরে ছড়ানোর জন্য)
সহজ রান্না করার প্রণালী বা নিয়ম
উপকরণগুলো গোছানো হয়ে গেলে নিচের সহজ ধাপগুলো অনুসরণ করে রান্না শুরু করে দিন:
- ধাপ ১ (শাঁস বের করা): প্রথমে আম খাওয়ার পর পাওয়া আঁটিগুলো ভালোভাবে জল দিয়ে ধুয়ে নিন। এরপর আঁটির বাইরের শক্ত খোলস বা কভারটি সাবধানে ভেঙে ভেতরের নরম সাদা শাঁসটি বের করে নিন। এবার এই শাঁসগুলোকে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে রাখুন।
- ধাপ ২ (ফোড়ন দেওয়া): রান্নার কড়াইয়ে ২ টেবিল চামচ সর্ষের তেল দিয়ে হালকা গরম করুন। তেল গরম হলে তাতে কালোজিরে এবং শুকনো লঙ্কার ফোড়ন দিন। ফোড়নের সুন্দর গন্ধ বের হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।
- ধাপ ৩ (সবজি ভাজা): এবার কড়াইয়ের তেলের মধ্যে আগে থেকে কিউব করে কেটে রাখা আলু এবং বেগুনের টুকরোগুলো দিয়ে দিন। মাঝারি আঁচে ২ থেকে ৩ মিনিট সবজিগুলো হালকা করে ভেজে নিন।
- ধাপ ৪ (মশলা কষানো): সবজি ভাজা হলে তার মধ্যে কেটে রাখা আমের আঁটির শাঁসের টুকরোগুলো দিয়ে দিন এবং ভালোভাবে নাড়াচাড়া করুন। এরপর হলুদ গুঁড়ো, লঙ্কার গুঁড়ো, স্বাদমতো নুন এবং সামান্য চিনি দিয়ে সবজি ও আঁটির মিশ্রণটি ভালোভাবে কষিয়ে নিন, যাতে মশলা সবকিছুর ভেতরে ঢোকে।
- ধাপ ৫ (সেদ্ধ করা): মশলা কষানো হয়ে গেলে তরকারিতে পরিমাণমতো জল বা পানি ঢেলে দিন। এবার কড়াইটি একটি ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিন এবং ১০ থেকে ১৫ মিনিট মাঝারি আঁচে রান্না করুন। এর ফলে আলু, বেগুন এবং আমের আঁটি খুব ভালোভাবে নরম ও সেদ্ধ হয়ে যাবে।
- ধাপ ৬ (শেষ ছোঁয়া): তরকারি মাখামাখা হয়ে এলে ওপর থেকে দুটি কাঁচা লঙ্কা চিরে দিন এবং আরও ২ মিনিট ফুটিয়ে নিন। সবশেষে ওপর থেকে তাজা ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে দিয়ে গরম গরম নামিয়ে নিন। ব্যাস, তৈরি হয়ে গেল আপনার চমৎকার আমের আঁটির তরকারি!
খাবারের অপচয় রোধে এক দারুণ উপায়
এই রান্নার সবচেয়ে বড় এবং সুন্দর সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে আমাদের দৈনন্দিন খাবারের অপচয় অনেক কমে যায়। সাধারণত যে আঁটি আমরা অপ্রয়োজনীয় বা আবর্জনা মনে করে ফেলে দিই, একটু বুদ্ধি খাটালে সেটিই একটি চমৎকার এবং জিভে জল আনা নতুন খাবারে পরিণত হতে পারে। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে যেকোনো খাবারের অপচয় কমানো অত্যন্ত ভালো একটি অভ্যাস।
গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী পদ
শহরের মানুষের কাছে এই রেসিপিটি একটু নতুন বা অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের অনেক গ্রামের বাড়িতে এখনও আমের আঁটির চচ্চড়ি, পাতলা ঝোল বা সুস্বাদু ভর্তা তৈরি করার নিয়ম রয়েছে। দুপুরের কড়া রোদে বা ঝুম বৃষ্টির দিনে গরম গরম ভাতের সঙ্গে আমের আঁটির এই মাখামাখা পদটি খেতে অসাধারণ লাগে। বিশেষ করে বর্ষাকালের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় এই ধরনের চটপটা রান্নার কদর গ্রাম বাংলায় অনেক বেশি।
প্রকৃতির কোনো কিছুই আসলে ফেলার নয়, যদি আমরা তার সঠিক ব্যবহার জানি। আমের আঁটি দিয়ে তৈরি এই তরকারিটি যেমন পুষ্টিকর, তেমনি আমাদের মুখের রুচি বদলাতে দারুণ কাজ করে। তাহলে আর দেরি কেন? এবার বাজার থেকে আম এনে খাওয়ার পর আঁটিগুলো ফেলে না দিয়ে আজই এই সহজ রেসিপিটি বাড়িতে ট্রাই করে দেখুন। পরিবারের সবাই এই নতুন ও ভিন্নধর্মী স্বাদের পদের প্রশংসা করতে বাধ্য হবে।








