দেশের অর্থনীতি যখন এক চরম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই ঘোষিত হলো নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। প্রতিবারের মতো এবারও বাজেট ঘোষণার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল দেখা দিয়েছে। এই বাজেট কি সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি আনবে, নাকি বাড়াবে কষ্টের মাত্রা? এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) প্রকাশ করেছে তাদের বিশেষ বাজেট পর্যালোচনা।
সিপিডির মতে, প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের বোঝা অনেক বেশি চাপানো হয়েছে। তবে এর বিপরীতে দেশের উচ্চ আয়ের মানুষেরা অর্থাৎ ধনীরা পাচ্ছেন বিশেষ সুবিধা। সংস্থাটি মনে করছে, সরকারের এই নতুন কর কাঠামো দেশে এক চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করেছে, যা সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
প্রস্তাবিত বাজেটে করের নতুন বিন্যাস: কার লাভ, কার ক্ষতি?
রোববার (২১ জুন) রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে ‘প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭ পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক সংলাপে সিপিডির পক্ষ থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি এবং সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বর্তমান কর ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো একে একে তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত সহজ ভাষায় দেখিয়েছেন যে, কীভাবে এই বাজেট সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলে ধনীদের কর ছাড়ের সুবিধা দিচ্ছে।
মধ্যবিত্তের পকেটে টান: করের হার বৃদ্ধির চিত্র
ফাহমিদা খাতুন তাঁর উপস্থাপনায় উল্লেখ করেন, নতুন কর কাঠামো অনুযায়ী যাদের বার্ষিক আয় ৬ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১৫ লাখ টাকার মধ্যে, তাদের করের বোঝা অনেক বেড়ে যাবে। হিসাব অনুযায়ী, এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের করের দায় আগের চেয়ে প্রায় সাড়ে ১২ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
একটি দেশের অর্থনীতিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণি হচ্ছে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। কিন্তু এই বাজেটে তাদের আয়ের ওপর সরাসরি আঘাত করা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যখন এমনিতেই আকাশছোঁয়া, তখন এই বাড়তি করের বোঝা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে আরও কঠিন করে তুলবে।
উচ্চ আয়ের মানুষদের জন্য বিশেষ সুবিধা: বৈষম্যের নতুন রূপ
সাধারণত কর ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য কমিয়ে আনা। অর্থাৎ, যাদের আয় বেশি তারা বেশি কর দেবেন, আর যারা কম আয়ের মানুষ তারা কম কর দিয়ে সরকারি সুবিধা বেশি পাবেন। কিন্তু সিপিডির দাবি অনুযায়ী, এবারের বাজেটে ঘটেছে তার ঠিক উল্টোটা।
যেখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের করের হার বাড়ানো হয়েছে, সেখানে উচ্চ আয়ের মানুষদের জন্য করের ক্ষেত্রে নানা ধরনের ছাড় ও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার যে অর্থনৈতিক ব্যবধান বা বৈষম্য রয়েছে, তা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার বড় ব্যবধান
একটি দেশের বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, যাতে বেকার যুবসমাজ কাজের সুযোগ পায়। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে দেশের এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করার একটি বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সিপিডির গভীর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক হতাশাজনক চিত্র।
এক কোটি চাকরির লক্ষ্য: স্লোগান নাকি বাস্তব পরিকল্পনা?
সিপিডি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, বাজেটে এই এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির কোনো স্পষ্ট বা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য বাজেটে যে ধরনের দূরদর্শী পদক্ষেপ বা নীতিমালার দরকার ছিল, তার অভাব রয়েছে। ফলে এই বিশাল লক্ষ্যটি কেবলই একটি ‘রাজনৈতিক স্লোগান’ হিসেবে থেকে যাওয়ার বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বা সংস্কার ছাড়া এত বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
থমকে থাকা প্রকল্প এবং budget বরাদ্দের স্থবিরতা
কর্মসংস্থান সৃষ্টির সাথে সরাসরি জড়িত থাকে শ্রম, প্রবাসী কল্যাণ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো। অথচ নতুন বাজেটে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিবর্তে হয় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, না হয় স্থবির করে রাখা হয়েছে।
পাশাপাশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ কিছু কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্প যেমন, পটুয়াখালী ইপিজেড এবং জামদানি ভিলেজের মতো প্রকল্পগুলো দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। এই প্রকল্পগুলো দ্রুত চালু করা গেলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারত। কিন্তু বাজেটে এই প্রকল্পগুলোকে গতিশীল করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা: কতটা বাস্তবসম্মত?
বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্টের কারণ হলো জিনিসপত্রের চড়া দাম বা মূল্যস্ফীতি। প্রতিদিন বাজারে গেলে সাধারণ মানুষকে হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার একটি লক্ষ্য ঠিক করেছে।
| সূচক বা বিষয় | বর্তমান অবস্থা (মে ২০২৬ পর্যন্ত) | বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা (২০২৬-২৭) |
| গড় মূল্যস্ফীতি | ৮.৬৩% | ৭.৫% |
| কর্মসংস্থান সৃষ্টি | স্থবির ও ধীরগতি | ১ কোটি (১৮ মাসে) |
বাজার ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি সংকটের চ্যালেঞ্জ
সিপিডি মনে করে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। কারণ, মে মাস পর্যন্ত দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
সংস্থাটির মতে, শুধু কাগজে-কলমে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই মূল্যস্ফীতি কমবে না। এর জন্য প্রয়োজন দেশের বাজার ব্যবস্থাপনার আমূল পরিবর্তন। বাজারে সিন্ডিকেট বা অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। সেই সাথে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব নয়, আর উৎপাদন খরচ না কমলে বাজারে পণ্যের দামও কমবে না।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ: সাধুবাদ ও বাস্তবায়নের বড় পরীক্ষা
নতুন বাজেটে সব খবরের মাঝে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে, যা সিপিডি তাদের আলোচনায় উল্লেখ করেছে। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এই দুটি খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বরাদ্দ বৃদ্ধি বনাম সঠিক ব্যবহারের পুরনো সংকট
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোকে সিপিডি সাধুবাদ জানিয়েছে। তবে দেশের অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বরাদ্দ বাড়ানোই শেষ কথা নয়। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে, এই দুই খাতে বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা সঠিকভাবে খরচ করা যায় না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাবে বরাদ্দের একটি বড় অংশ অপচয় হয় অথবা অব্যবহৃত থেকে যায়। তাই এই বাড়তি বরাদ্দের সঠিক, স্বচ্ছ ও কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সিপিডির মূল্যায়ন: বাজেট কি শুধুই ‘অতি আশাবাদী’?
সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করে সিপিডি নতুন বাজেটের লক্ষ্যগুলোকে ‘অতি আশাবাদী’ বলে আখ্যায়িত করেছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা যেমন— রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি, ডলার সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি— এসব বিষয়কে পুরোপুরি বিবেচনায় না নিয়ে একটি বড় বাজেট দেওয়া হয়েছে।
বাজেটের লক্ষ্যগুলো চমৎকার শোনালেও বর্তমান প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সংস্কারহীন ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলো অর্জন করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে ধনীদের সুবিধা দেওয়ার এই প্রবণতা দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক টেকসইতার জন্য কল্যাণকর নয় বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় করণীয়
একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিই হলো সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের স্বার্থকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। মধ্যবিত্তের ওপর করের চাপ কমিয়ে কীভাবে তাদের জীবনযাত্রা সহজ করা যায়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। একই সাথে কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করে দেশের বেকার যুবকদের কাজের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। সরকার যদি সিপিডির এই গঠনমূলক সমালোচনা ও পরামর্শগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে বাজেটে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনে, তবেই এই বাজেট দেশের সর্বস্তরের মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।








