হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
সোমবার, জুন ২২, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeইসলাম ও জীবনআশুরার শিক্ষা: পবিত্র মুহাররম ও আমাদের করণীয়
spot_img

আশুরার শিক্ষা: পবিত্র মুহাররম ও আমাদের করণীয়

আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনকে সুন্দর ও ইবাদতের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করার জন্য বছরজুড়ে বিভিন্ন সময় ও উপলক্ষকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। আরবি হিজরি বছরের প্রথম মাস ‘মুহাররম’ তেমনই একটি বরকতময় ও সম্মানিত মাস। এই মাসটি শুধু একটি নতুন বছরের সূচনাই নয়, বরং এটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এবং সম্মানিত চারটি মাসের অন্যতম।

এই পবিত্র মাসে নফল রোজা পালন করা, বিশেষ করে আশুরার রোজা রাখা একজন মুমিনের জন্য বিগত এক বছরের গুনাহ মাফের এক দুর্দান্ত সুযোগ। তাই মুহাররমের প্রকৃত তাৎপর্য জানা, ইসলামের সঠিক ইতিহাস বোঝা এবং সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা আশুরার শিক্ষা এবং এই মাসে একজন মুসলিমের করণীয় কাজগুলো সহজ ভাষায় আলোচনা করব।

মুহাররম কী এবং এর গুরুত্ব

মুহাররম হলো হিজরি সনের প্রথম মাস। ইসলামে যে চারটি মাসকে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত ও যুদ্ধবিগ্রহের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, মুহাররম তার মধ্যে একটি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এই মাসের মর্যাদা সম্পর্কে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা সুরা আত-তাওবাহর ৩৬ নম্বর আয়াতে বলেন,

“নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধানে মাসের সংখ্যা বারোটি। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত।”

ইসলামের পরিভাষায় এই চারটি সম্মানিত মাস হলো: ১. জিলকদ ২. জিলহজ ৩. মুহাররম ৪. রজব

এই মাসগুলোতে ইবাদত করার সওয়াব যেমন অনেক বেশি, তেমনই এই সময়ে কোনো অন্যায় বা গুনাহের কাজ করাও অন্যান্য মাসের চেয়ে বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

মুহাররম মাসের বিশেষ ফজিলত

মুহাররম মাসের মর্যাদাকে বোঝানোর জন্য আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) একে ‘আল্লাহর মাস’ বলে অভিহিত করেছেন। ইসলামের ইতিহাসে অন্য কোনো মাসকে সরাসরি আল্লাহর মাস বলা হয়নি, যা এই মাসের অনন্য শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেয়।

হাদিস শরিফে নবীজি (সা.) বলেছেন,

“রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ১১৬৩)

এই হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, পুরো বছরের মধ্যে রমজান মাসের ফরজ রোজার পর যদি কোনো নফল রোজার মর্যাদা ও সওয়াব সবচেয়ে বেশি থাকে, তবে তা হলো এই মুহাররম মাসের রোজা। তাই পুরো মাসজুড়েই সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি বেশি নফল রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

আশুরা: ইতিহাসের এক মহিমান্বিত দিন

মুহাররম মাসের ১০ তারিখকে ইসলামের পরিভাষায় ‘ইয়াওমে আশুরা’ বা আশুরার দিন বলা হয়। এই দিনটি পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক বড় বড় ঘটনার সাক্ষী। তবে সবচেয়ে প্রধান ও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত ঘটনা হলো এই দিনে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবী হযরত মুসা (আ.) এবং বনী ইসরাঈলকে অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের জুলুম থেকে অলৌকিকভাবে মুক্তি দিয়েছিলেন।

আল্লাহ তাআলা লোহিত সাগর দ্বিখণ্ডিত করে মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের পার করে দেন এবং অত্যাচারী ফেরাউনকে তার বিশাল বাহিনীসহ সাগরের পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস করেন।

যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করে আগমন করেন, তখন তিনি দেখতে পান যে মদিনার ইহুদিরা এই ১০ মুহাররম তারিখে রোজা রাখছে। নবীজি (সা.) তাদের এই রোজার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে, “এটি একটি মহান দিন; এই দিনে আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আ.)-কে বিজয় দান করেছিলেন এবং ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। তাই মুসা (আ.) আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এই দিন রোজা রেখেছিলেন, আমরাও তাই রাখি।”

আশুরার রোজা: একটি গুরুত্বপূর্ণ নববী সুন্নাহ

ইহুদিদের মুখে এই ঘটনা শোনার পর আমাদের প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন,

“মুসার (আ.) ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে অনেক বেশি হকদার।”

অর্থাৎ, নবী হিসেবে হযরত মুসা (আ.)-এর আনন্দের দিনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার অধিকার মুসলমানদের আরও বেশি। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে আশুরার দিন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে রোজা পালন করেন এবং সমস্ত সাহাবিদেরও এই রোজা রাখার নির্দেশ দেন। (সহীহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ২০০৪)

আশুরার রোজার অসাধারণ ফজিলত

আশুরার দিনের একটিমাত্র রোজা আমাদের জীবনে আল্লাহর অসীম রহমত বয়ে আনতে পারে। এটি আমাদের ছোটখাটো বা সগীরা গুনাহগুলো মাফ করার একটি বড় মাধ্যম।

হাদিস শরিফে এই রোজার পুরস্কার সম্পর্কে বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,

“আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা তার বিগত এক বছরের গুনাহসমূহ মাফের কারণ হবে।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ১১৬২)

মাত্র একটি রোজার বিনিময়ে পেছনের পুরো এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেওয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিন বান্দাদের জন্য এক বিশাল উপহার বা অফার।

কেন ৯ ও ১০ মুহাররম একসাথে রোজা রাখা উত্তম?

যেহেতু মদিনার ইহুদিরাও ১০ মুহাররম তারিখে একটি রোজা রাখত, তাই মুসলমানদের ইবাদত যেন অন্য ধর্মের রীতিনীতির সাথে হুবহু মিলে না যায়, সেজন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি চমৎকার কৌশল ও নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। তিনি ইহুদিদের থেকে মুসলিম উম্মাহর স্বাতন্ত্র্য ও ভিন্নতা বজায় রাখতে ১০ তারিখের আগের দিন অর্থাৎ ৯ তারিখও রোজা রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর ইন্তেকালের আগের বছর বলেছিলেন,

“আমি যদি আগামী বছর পর্যন্ত জীবিত থাকি, তবে অবশ্যই নবম তারিখেও (১০ তারিখের সাথে মিলিয়ে) রোজা পালন করব।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ১১৩৪)

নবীজি (সা.) আগামী বছর আসার আগেই ইন্তেকাল করেন, তবে তাঁর এই ইচ্ছাটি মুসলমানদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ বা দিকনির্দেশনা হয়ে আছে। এই কারণে ইসলামী স্কলার বা আলেমগণ আশুরার রোজার কয়েকটি স্তর নির্ধারণ করেছেন:

  • সর্বোত্তম পদ্ধতি: মুহাররম মাসের ৯ এবং ১০ তারিখ একসাথে মিলিয়ে ২টি রোজা রাখা।
  • আরও একটি ভালো পদ্ধতি: ৯, ১০ এবং ১১ মুহাররম এই টানা ৩টি রোজা রাখা।
  • ন্যূনতম পদ্ধতি: যদি কেউ কোনো কারণে আগের দিন রোজা রাখতে না পারেন, তবে অন্তত শুধু ১০ মুহাররম তারিখে ১টি রোজা রাখা (তবে শুধু ১টি রোজা রাখা মাকরূহে তানজিহী বা অনুত্তম)।

কারবালার ঘটনা ও আমাদের করণীয়

মুহাররম মাসের কথা আসলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে কারবালার প্রান্তরের সেই নির্মম ও হৃদয়বিদারক ঘটনা। হিজরি ৬১ সনের ১০ মুহাররম তারিখে ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে নবী করিম (সা.)-এর অত্যন্ত আদরের দৌহিত্র, জান্নাতের যুবকদের নেতা হযরত হুসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে শাহাদাত বরণ করেছিলেন।

নিশ্চয়ই কারবালার এই ঘটনা মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের অন্যতম একটি বেদনাদায়ক ও কালো অধ্যায়। একজন সত্যিকারের মুসলিম হিসেবে আমরা হযরত হুসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারকে মনে-প্রাণে ভালোবাসি। আমরা তাঁদের এই মহান ত্যাগ থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করার শিক্ষা গ্রহণ করি এবং তাঁদের জান্নাতুল ফেরদাউসের উচ্চ মাকাম দান করার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করি।

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, আশুরার মূল তাৎপর্য কিন্তু কারবালার ঘটনার কারণে নয়। কারবালার ঘটনার শত শত বছর আগে থেকেই আশুরার দিনটি ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ ছিল।

শোক প্রকাশের নামে যেসব কাজ ইসলামে নিষিদ্ধ

আজকাল দেখা যায়, আশুরার দিন আসলে অনেকেই কারবালার শোক প্রকাশের নামে এমন কিছু কাজ করেন যা ইসলাম ও সুন্নাহর সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইসলামে কোনো মানুষের মৃত্যুর পর এভাবে আনুষ্ঠানিক শোক পালন করার সুযোগ নেই।

তাই আশুরা উপলক্ষে নিচে দেওয়া কাজগুলো থেকে আমাদের অবশ্যই দূরে থাকতে হবে:

  • নিজের শরীরে দা বা চেইন দিয়ে আঘাত করা।
  • শরীরকে রক্তাক্ত করা বা নিজের ক্ষতি করা।
  • বুক চাপড়ে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ বলে মাতম বা আহাজারি করা।
  • রাস্তায় ঢোল-তবলা বাজিয়ে ভুয়া বা প্রতীকী কবর বানিয়ে তাজিয়া মিছিল বের করা।
  • চিৎকার-চেঁচামেচি করে কান্নাকাটির ভন্ডামি করা।

এই ধরনের সব কাজকে ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বা হারাম করা হয়েছে। বিদআত ও জাহেলি যুগের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সতর্ক করে আমাদের প্রিয় নবী (সা.) পরিষ্কারভাবে বলেছেন,

“সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত বা আমাদের আদর্শের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে (শোকের কারণে) নিজের গালে আঘাত করে, নিজের কাপড় ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহেলি যুগের মতো চিৎকার করে আহাজারি করে।” (সহীহ বুখারি: ১২৯৪, সহীহ মুসলিম: ১০৩)

মুহাররম ও আশুরার দিনে একজন মুসলিমের করণীয় কাজ

পবিত্র মুহাররম মাসকে অবহেলা বা শুধু কান্নাকাটি করে পার না করে, একজন সচেতন ও ঈমানদার মুসলিম হিসেবে আমাদের কিছু বিশেষ আমল করা উচিত। নিচে সহজ কয়েকটি আমলের তালিকা দেওয়া হলো:

১. বেশি বেশি নফল রোজা রাখা

পুরো মুহাররম মাস জুড়েই সুযোগ বুঝে বেশি বেশি নফল রোজা রাখার চেষ্টা করুন। কারণ এটি আল্লাহর মাস এবং এই মাসের নফল রোজা অন্য যেকোনো নফল রোজার চেয়ে উত্তম।

২. আশুরার সুন্নাহ রোজা রাখা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো মুহাররমের ৯ ও ১০ তারিখে (অথবা ১০ ও ১১ তারিখে) রোজা রাখা। যদি কোনো কারণে ২টি সম্ভব না হয়, তবে অন্তত ১০ তারিখের রোজাটি কোনোভাবেই মিস করা উচিত নয়।

৩. খাঁটি মনে তওবা ও ইস্তিগফার করা

যেহেতু এটি একটি সম্মানিত মাস, তাই নিজের পেছনের সব ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে হাত তুলে ক্ষমা চান। বেশি বেশি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পাঠ করুন। এই মাসে তওবা করলে আল্লাহ তাআলা বান্দার তওবা দ্রুত কবুল করেন।

৪. কুরআন তিলাওয়াত ও নফল সালাত বৃদ্ধি করা

দৈনন্দিন ব্যস্ততা কমিয়ে এই পবিত্র দিনগুলোতে বেশি বেশি কুরআন মাজিদ তিলাওয়াত করুন এবং রাতে তাহাজ্জুদসহ অন্যান্য নফল নামাজ পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

৫. দান-সদকা করা

দরিদ্র ও অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের অন্যতম সুন্দর শিক্ষা। আশুরার দিনে বা এই মাসে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী গরিবদের খাবার খাওয়ানো বা টাকা-পসা দিয়ে সাহায্য করলে আল্লাহ তাআলা সম্পদে বরকত দান করেন।

৬. কুসংস্কার ও বিদআত বর্জন করা

সমাজ বা ইন্টারনেটে প্রচলিত বিভিন্ন ভিত্তিহীন গল্প, সিনেমা বা কারবালার মনগড়া কাহিনী বিশ্বাস করা থেকে বিরত থাকুন। এই দিনে খিচুড়ি রান্না করতেই হবে বা বিশেষ কোনো পোশাক পরতেই হবে এমন কোনো নিয়ম ইসলামে নেই। এগুলো বর্জন করে শুধু সুন্নাহসম্মত আমলগুলো পরিবার ও সমাজে প্রচার করুন।


পরিশেষে বলা যায়, মুহাররম বা আশুরা কোনো নির্দিষ্ট দুঃখ প্রকাশের বা শোকের মাস নয়; বরং এটি হলো আল্লাহর ইবাদত, নিজের আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার এক অনন্য মাস। আশুরার রোজা ও এর শিক্ষা আমাদের নবী মুসা (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক বিজয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যা আমাদের শেখায় যে—পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, আল্লাহর সাহায্যের প্রতি মুমিনের বিশ্বাস সবসময় দৃঢ় রাখতে হবে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!