হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
মঙ্গলবার, জুন ৩০, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeশিক্ষাশিক্ষকদের বেতন জোগাতে নিজেই নৌকা চালাচ্ছেন প্রধান শিক্ষক: পাহাড়ের এক অনন্য সংগ্রাম
spot_img

শিক্ষকদের বেতন জোগাতে নিজেই নৌকা চালাচ্ছেন প্রধান শিক্ষক: পাহাড়ের এক অনন্য সংগ্রাম

দুর্গম পাহাড়ের শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল থানচির তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়। কিন্তু অভাব আর আর্থিক সংকট সেই যাত্রায় বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সেই বাধা হার মেনেছে এক প্রধান শিক্ষকের অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে। নিজের শিক্ষকদের বেতন জোগাতে এবং শিক্ষার্থীদের পারাপারের সুবিধার্থে নিজেই এখন ইঞ্জিনচালিত বোটের চালক হয়ে উঠেছেন প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন।

বান্দরবান জেলা শহর থেকে প্রায় ৮৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত থানচি উপজেলার তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়। দুর্গম এই এলাকায় শিক্ষার দীপশিখা হয়ে ওঠা বিদ্যালয়টির বর্তমান প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং কেবল পাঠদানই করেন না, ছুটির দিনে পর্যটকবাহী বোট চালিয়ে যা আয় করেন, তা বিলিয়ে দেন সহকর্মীদের হাতে।

উচ্চশিক্ষিত হয়েও নেই কোনো অহংকার

বামং খিয়াং মিংলেন একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ। তিনি কক্সবাজার সিটি কলেজ থেকে ২০১৮ সালে এমবিএ সম্পন্ন করেন এবং পরে কক্সবাজার টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০২০ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ৫৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।

কেন তিনি নৌকার হাল ধরলেন

বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের হওয়ায় তাদের কাছ থেকে মাসিক বেতন আদায় করা সম্ভব হয় না। ফলে শিক্ষকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দেওয়া ছিল একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই সমস্যা সমাধানে থানচি উপজেলা প্রশাসন থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত বোট বরাদ্দ দেওয়া হয়।

প্রধান শিক্ষক জানান, অন্য চালক রাখলে তাকে আলাদা মজুরি দিতে হয়, আবার অনেক সময় আয়ের সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। তাই শিক্ষকদের জন্য সামান্য কিছু অর্থ সাশ্রয় করতে তিনি নিজেই পর্যটন মৌসুমে প্রতি শুক্র, শনি ও সরকারি ছুটির দিনে থানচি-তিন্দু-রেমাক্রী রুটে বোট চালান।

অভাবের সংসারে সামান্য আশার আলো

গত মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এই বোট চালিয়ে আয় হয়েছে ৪৯ হাজার ১০০ টাকা। এর মধ্যে ৩০ হাজার টাকাই তিনি তুলে দিয়েছেন শিক্ষকদের বেতন হিসেবে। সহকারী শিক্ষক পাওয়ারি ম্রো আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “প্রধান শিক্ষক হয়েও উনার মধ্যে কোনো অহংকার নেই। এই সামান্য অর্থ দিয়েই আমরা কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছি এবং পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি। উনার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।”

শিক্ষার্থীদের চোখে ‘হিরো’ এই শিক্ষক

শুধু আয়ের জন্যই নয়, শিক্ষার্থীদের সাঙ্গু নদী পারাপার এবং বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও এই বোট ও চালক বামং খিয়াং অন্যতম ভরসা। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মেওয়াই মারমা জানায়, “আমাদের স্যার আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করেন। তিনি সবসময় আমাদের পড়ালেখা আর স্কুলের কথা ভাবেন।”

প্রশাসনের সহযোগিতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল জানান, দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়গুলোর টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে তিন্দু ও রেমাক্রী এলাকায় দুটি বোট দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে পর্যটক পরিবহনের আয় থেকে শিক্ষকরা কিছুটা হলেও আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে আরও একটি বোট দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে প্রশাসনের। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণকাজও চলমান।


বামং খিয়াং মিংলেনের এই সংগ্রাম কেবল বেতন জোগানোর লড়াই নয়, এটি দুর্গম পাহাড়ের পিছিয়ে পড়া শিশুদের আলোকিত করার এক নিরন্তর যুদ্ধ। যখন স্বার্থের টানে মানুষ পেশা বদলায়, তখন একজন প্রধান শিক্ষকের এমন ত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় শিক্ষক মানেই শুধু পাঠদান নয়, শিক্ষক মানেই হলো এক আলোকবর্তিকা।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!