মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে শান্তি, ন্যায় এবং আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনা আর নফসের তাড়নায় মানুষ প্রায়ই ভুল পথে পা বাড়ায়। পবিত্র কুরআন কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, এটি মানুষের জীবন চলার পূর্ণাঙ্গ সংবিধান। এই সংবিধানে যেখানে পুরস্কারের ঘোষণা আছে, ঠিক সেখানেই অবাধ্যদের জন্য দেওয়া হয়েছে ‘ওয়াইল’ বা ধ্বংসের বার্তা।
আজকের প্রতিবেদনে আমরা কুরআনের আয়াত ও প্রেক্ষাপটসহ আলোচনা করবো সেই সাত শ্রেণির হতভাগা মানুষদের সম্পর্কে, যাদের জন্য আল্লাহ তাআলা ধ্বংস নিশ্চিত করেছেন।
১. পরনিন্দাকারী ও অপবাদ রটনাকারী
সমাজে বিভেদ সৃষ্টির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো গীবত বা পরনিন্দা। অন্যের অনুপস্থিতিতে তার দোষ চর্চা করা ইসলামে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সমান অপরাধ। বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আমরা খুব সহজেই অন্যের চরিত্র নিয়ে কথা বলি, যা এই গুনাহকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
কুরআনের বাণী:
وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزةٍ لُّمَزَةٍ
অর্থ: ধ্বংস প্রত্যেক নিন্দাকারী ও পরনিন্দাকারীর জন্য।’ (সূরা আল-হুমাযাহ: আয়াত ১)
যারা অন্যের সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, তারা আসলে নিজেদের আমলনামাই ধ্বংস করছে। ইসলামি শরিয়তে মানুষের রক্ত এবং ধন-সম্পদের চেয়েও তার সম্মানের মূল্য বেশি দেওয়া হয়েছে।
২. অনুমানভিত্তিক ও ভিত্তিহীন কথা বলা ব্যক্তি
আজকের যুগে গুজব একটি মহামারির নাম। কোনো তথ্য যাচাই না করেই ‘শুনেছি’ বা ‘মনে হয়’ বলে প্রচার করা ইসলামে নিষিদ্ধ। গুজব ছড়ানোর ফলে ব্যক্তি, পরিবার এমনকি রাষ্ট্রও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
কুরআনের বাণী:
قُتِلَ الْخَرَّاصُونَ
অর্থ: ধ্বংস হোক অনুমানভিত্তিক কথা বলাদের।’ (সূরা আয-যারিয়াত: আয়াত ১০)
একজন সচেতন মুসলিমের কাজ হলো কোনো খবর কানে এলে তা যাচাই করা। ভিত্তিহীন কথা শুধু মিথ্যাই নয়, এটি আমানতের খিয়ানতও বটে।
৩. আল্লাহর সঙ্গে শরিককারী (মুশরিক)
শিরক হলো সব গুনাহের মূল। আল্লাহ তাআলা সব গুনাহ মাফ করলেও শিরকের গুনাহ তাওবা ছাড়া মাফ করেন না। আল্লাহর ইবাদত, ক্ষমতা কিংবা গুণাবলিতে অন্য কাউকে অংশীদার মনে করাই হলো শিরক।
কুরআনের বাণী:
فَوَيْلٌ لِّلْمُشْرِكِينَ
অর্থ: অতএব ধ্বংস মুশরিকদের জন্য।’ (সূরা হা-মীম সাজদাহ: আয়াত ৬)
তাওহিদের ওপর অটল থাকা ইমানের মূল দাবি। ইমানকে বিশুদ্ধ না রাখলে দুনিয়ার সব আমল মূল্যহীন হয়ে যায়।
৪. আল্লাহর নামে মিথ্যা রটনাকারী
নিজস্ব স্বার্থ হাসিল বা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে অনেকেই ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দেয় কিংবা আল্লাহর নামে মিথ্যা কথা বলে। এটি কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং সমাজকে পথভ্রষ্ট করার নামান্তর।
কুরআনের বাণী:
وَلَكُمُ الْوَيْلُ مِمَّا تَصِفُونَ
অর্থ: আর তোমরা যা বর্ণনা কর (আল্লাহর নামে মিথ্যা বলো) তার জন্য তোমাদের ধ্বংস।’ (সূরা আল-আম্বিয়া: আয়াত ১৮)
ধর্মীয় বিষয়ে জ্ঞান ছাড়া কথা বলা বা ভুল ফতোয়া দেওয়া থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলিমের ইমানি দায়িত্ব।
৫. মানুষকে সামনাসামনি অপমানকারী
কাউকে ব্যঙ্গ করা, ছোট করা বা তার শারীরিক গঠন নিয়ে বিদ্রূপ করা ইসলামে জঘন্যতম কাজ। অনেক সময় আমরা মজা করার ছলে অন্যকে অপমান করি, যা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত ঘৃণিত।
কুরআনের বাণী:
وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزةٍ لُّمَزَةٍ
অর্থ: দুর্ভোগ (ধ্বংস) এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে (সামনাসামনি) মানুষের নিন্দা করে আর (অসাক্ষাতে) দুর্নাম করে।’ (সূরা আল-হুমাযাহ: আয়াত ১)
মানুষের হৃদয় ভাঙা কাবা ঘর ভাঙার চেয়েও বড় অপরাধ হিসেবে অনেক বিশেষজ্ঞ বর্ণনা করেছেন। তাই আচার-আচরণে সংযমী হওয়া জরুরি।
৬. অভ্যস্ত মিথ্যাবাদী ও পাপাচারী
মিথ্যা হলো সব পাপের জননী। যে ব্যক্তি কথায় কথায় মিথ্যা বলে, তার অন্তরে নূর থাকে না। পাপাচার বা গুনাহের কাজে লিপ্ত থাকা মানুষের হৃদয়কে শক্ত করে দেয়।
কুরআনের বাণী:
وَيْلٌ لِّكُلِّ أَفَّاكٍ أَثِيمٍ
অর্থ: ধ্বংস প্রত্যেক মিথ্যাবাদী পাপাচারীর জন্য।’ (সূরা আল-জাসিয়াহ: আয়াত ৭)
সত্যবাদিতা মানুষকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যায় আর মিথ্যা মানুষকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে ঠেলে দেয়।
৭. ওজনে কম দেওয়া বা ব্যবসায় প্রতারণাকারী
ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। ওজনে কম দেওয়া বা ভেজাল পণ্য বিক্রি করে অধিক মুনাফা অর্জন করা এক ধরনের চুরি। এটি মানুষের হক বা ‘হক্কুল ইবাদ’ নষ্ট করার শামিল।
কুরআনের বাণী:
وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ
অর্থ: ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়।’ (সূরা আল-মুতাফফিফিন: ১)
হালাল রিজিকে বরকত থাকে। প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দুনিয়াতে অশান্তি এবং আখিরাতে ধ্বংস ডেকে আনে।
এই ধ্বংস থেকে বাঁচার উপায় কী?
আল্লাহ তাআলা কেবল সতর্ক করেননি, বরং বাঁচার পথও দেখিয়েছেন। এই ধ্বংসাত্মক কাজগুলো থেকে বাঁচতে আমাদের করণীয়:
১. তওবা করা: অতীতের ভুলের জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
২. জ্ঞান অর্জন: ইসলামি বিধান এবং অন্যের অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা।
৩. জবান নিয়ন্ত্রণ: অপ্রয়োজনীয় কথা ও গীবত থেকে মুখ বন্ধ রাখা।
৪. সততা: ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত জীবনে শতভাগ সততা বজায় রাখা।
৫. মানুষের হক আদায়: কারও সম্মান বা সম্পদ নষ্ট করলে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে তা পূরণ করা।
পবিত্র কুরআনের এই সতর্কবাণীগুলো আমাদের জীবনকে সুন্দর করার জন্য। আমরা যদি নিজেদের চরিত্রকে এই সাতটি ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে মুক্ত রাখতে পারি, তবেই আমাদের ইহকাল ও পরকাল সফল হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করুন এবং এসব ভয়াবহ পরিণাম থেকে রক্ষা করুন। আমিন।








