বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে এক সময় মহেশখালীকে ‘এনার্জি হাব’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে বড় একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প মহেশখালী থেকে সরিয়ে ভারতের ঝাড়খণ্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে এখন দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিবর্তনের পেছনে কোনো যৌক্তিক নথিপত্র বা দাপ্তরিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
মহেশখালী কেন ছিল আদর্শ স্থান?
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে মহেশখালী যেকোনো বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য আদর্শ স্থান। সমুদ্রের খুব কাছে হওয়ায় সরাসরি জাহাজ থেকে কয়লা নামানো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা এখানে অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী। কিন্তু এই সহজ পথ বাদ দিয়ে কেন জটিল ও ব্যয়বহুল পথ বেছে নেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ঝাড়খণ্ড প্রকল্পের নেপথ্যে অমীমাংসিত প্রশ্ন
অভিযোগ উঠেছে যে, ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি করার পেছনে কোনো শক্তিশালী অর্থনৈতিক যুক্তি ছিল না। এর কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- কয়লা নিয়ে জটিলতা: ভারতের আইন অনুযায়ী তাদের নিজস্ব কয়লা দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিদেশে রপ্তানি করা নিষেধ। এটি জানার পরও সেখানে প্রকল্প করা হয়েছে।
- অস্ট্রেলিয়া থেকে কয়লা আমদানি: ঝাড়খণ্ডের জন্য কয়লা আনা হচ্ছে সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে। জাহাজ থেকে নামানোর পর সেই কয়লা কয়েকশ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ট্রেনে করে ঝাড়খণ্ডে নেওয়া হয়।
- অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়: এই দীর্ঘ পথ কয়লা পরিবহনের খরচ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকেই দিতে হচ্ছে। অথচ মহেশখালীতে করলে এই খরচ অনেকাংশেই কমে যেত।
সঞ্চালন লাইনের বাড়তি ঝুঁকি ও খরচ
শুধুমাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, ঝাড়খণ্ড থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আনতে দীর্ঘ ট্রান্সমিশন বা সঞ্চালন লাইন তৈরি করতে হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই দীর্ঘ লাইনের কারণে বিদ্যুতের সিস্টেম লস যেমন বাড়ছে, তেমনি অবকাঠামোগত খরচও আকাশচুম্বী হয়েছে। যেখানে মহেশখালী থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব ছিল, সেখানে বিদেশি জমির ওপর নির্ভরতা কতটুকু যৌক্তিক তা নিয়ে বিতর্ক চলছে।
কোনো স্বচ্ছতা নেই নথিপত্রে!
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধান চালিয়েও সরকারি কোনো নথিতে এর সন্তোষজনক উত্তর মেলেনি। কেন মহেশখালীকে উপেক্ষা করা হলো এবং কার স্বার্থে এই স্থানান্তর, তার কোনো রেকর্ড জনসম্মুখে নেই। বক্তারা দাবি তুলেছেন, এই প্রকল্পের চুক্তি ও স্থান নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি পুনরায় তদন্ত করা উচিত।
জাতীয় স্বার্থ না কি ব্যক্তিগত লাভ?
বিদ্যুৎ খাতের এই বিশালাকার প্রকল্পের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি থাকাটা জরুরি ছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পুরো প্রক্রিয়াটি অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক এবং এর পেছনে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে। দেশের টাকা বাইরে চলে যাওয়ার এই সংস্কৃতি বন্ধে সব নথি জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি এখন জোরালো হচ্ছে।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এমন বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি। মহেশখালীর মতো সম্ভাবনাকে কাজে না লাগিয়ে কেন দুর্গম পথ বেছে নেওয়া হলো, তার জবাব খোঁজা এখন সময়ের দাবি।








