উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে টিকে থাকার লড়াইয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য সুখবর হিসেবে এসেছিল বাড়তি ইনক্রিমেন্ট। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে শ্রমিক আন্দোলনের মুখে সরকার নিয়মিত ৫ শতাংশের সঙ্গে আরও ৪ শতাংশ যোগ করে মোট ৯ শতাংশ বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের সুফল সব শ্রমিক সমানভাবে পাচ্ছেন না। বড় ও কমপ্লায়েন্ট কারখানাগুলো নিয়ম মানলেও, ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো নানা অজুহাতে শ্রমিকদের বঞ্চিত করছে।
বড় কারখানায় স্বস্তি, ছোট কারখানায় অসন্তোষ
পোশাক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের বড় কারখানাগুলো বিদেশি বায়ার বা ক্রেতাদের কমপ্লায়েন্স ধরে রাখতে শ্রমিকদের প্রাপ্য ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট পরিশোধ করছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার বিখ্যাত ব্র্যান্ডের কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে সচেতন। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে সাবকন্ট্রাকটিং বা ঠিকায় কাজ করা ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোতে।
শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, ছোট কারখানাগুলো তদারকির অভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে। তারা গত বছরও অনেকে বেতন বাড়ায়নি, এবারও টালবাহানা করছে। এতে সাধারণ শ্রমিকরা বাসা ভাড়া ও নিত্যপণ্যের দামের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।
মালিকপক্ষ কী বলছে?
কারখানা মালিকরা বর্তমান ব্যবসায়িক পরিস্থিতিকে বেশ নাজুক বলে দাবি করছেন। তাদের মতে, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট এবং চট্টগ্রাম বন্দরে খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।
বিজিএমইএ-এর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, “বর্তমানে ব্যবসা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যারা সামর্থ্যবান, তারা ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিচ্ছে। কিন্তু অনেক মাঝারি কারখানার মালিক জানিয়েছেন, তাদের পক্ষে এই বাড়তি খরচ বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা কাউকে চাপ দিচ্ছি না, এটি সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে।”
অন্যদিকে বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, সরকার থেকে এবারের ইনক্রিমেন্ট নিয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা আসেনি। তাই মালিকদের মধ্যে এক ধরনের ধোঁয়াশা কাজ করছে। তবে যাদের সামর্থ্য আছে, তারা দিচ্ছেন।
সরকারি সিদ্ধান্ত ও নতুন শ্রম আইন
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শ্রমিকদের ১৮ দফা দাবির প্রেক্ষিতে শ্রম মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে। সেই কমিটির সিদ্ধান্ত ছিল, নতুন মজুরি কাঠামো না হওয়া পর্যন্ত ৫ শতাংশের সঙ্গে বাড়তি ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বলবৎ থাকবে।
এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকার শ্রম আইন সংশোধন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। আগে প্রতি পাঁচ বছর পর পর মজুরি পুনর্মূল্যায়ন করা হতো, এখন থেকে তা তিন বছর পর পর হবে। সেই হিসেবে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কার্যকর হওয়া ১২,৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরির কাঠামোটি আগামী ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে পরিবর্তিত হওয়ার কথা।
শ্রমিক নেতারা বলছেন, এই ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট কেবল মূল বেতন নয়, বরং ওভারটাইম, উৎসব ভাতা এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধাও বাড়িয়ে দেয়। তাই এটি শ্রমিকদের অধিকার।
পরিসংখ্যান কী বলে?
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ম্যাপড ইন বাংলাদেশ’-এর তথ্যমতে, দেশে ৩ হাজার ৩২০টি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা রয়েছে। শিল্প পুলিশের গত বছরের তথ্যে দেখা গেছে:
- গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন জোনের প্রায় ৭৩ শতাংশ কারখানা ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিয়েছে।
- প্রায় ৭৮৪টি কারখানা বাড়তি সুবিধা দেয়নি।
- নারায়ণগঞ্জের ৪২৪টি কারখানার শতভাগই নিয়ম মেনে বেতন বাড়িয়েছে, যা একটি ইতিবাচক দিক।
- তবে চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের অনেক কারখানায় এখনো এই হার সন্তোষজনক নয়।
শ্রমিক নেতাদের দাবি
শ্রমিক নেতা বাবুল আখতার এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, “এটি আইনের লঙ্ঘন। যেসব মালিক ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিচ্ছেন না, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
অন্যদিকে, আইবিসি-এর সাবেক মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপন মনে করেন, এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ নেই। নতুন মজুরি কাঠামো না হওয়া পর্যন্ত ৯ শতাংশ হারেই ইনক্রিমেন্ট দিতে হবে। চলতি সপ্তাহ শেষেই বোঝা যাবে আসলে কত শতাংশ কারখানা এবার নিয়ম মেনেছে।








