চিকিৎসা বিজ্ঞানে ক্যানসারের ওষুধ আবিষ্কার নিঃসন্দেহে একটি মহান কাজ। কিন্তু এই মহৎ কাজের দোহাই দিয়ে যদি চলে পুকুরচুরি, তবে তা সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের মূলে আঘাত হানে। ঠিক এমনই এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে প্রতিবেশী দেশ ভারতে। ক্যানসারের ওষুধ তৈরির নামে সেখানে সরকারি তহবিলের কোটি কোটি টাকা নয়ছয় করার অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে পুরো ভারতজুড়ে।
ভারতের মধ্যপ্রদেশের একটি সরকারি ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলা এই গবেষণায় গরুর গোবর ও মূত্র ব্যবহার করে ক্যানসার নিরাময়ের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ এক দশক পার হয়ে গেলেও মেলেনি কোনো ফলাফল, বরং বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ আর্থিক দুর্নীতির চিত্র।
গোবর ও গোমূত্র গবেষণার আসল রহস্য
ঘটনার সূত্রপাত ২০১১ সালে। মধ্যপ্রদেশের নানাজি দেশমুখ ভেটেরিনারি সায়েন্স ইউনিভার্সিটিতে একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল গরুর গোবর এবং মূত্র ব্যবহার করে ক্যানসার বা কর্কট রোগের প্রতিষেধক বা ওষুধ তৈরি করা। শুনতে কিছুটা অবৈজ্ঞানিক মনে হলেও, সরকারি খরচে এই গবেষণাটি শুরু হয় বেশ জাঁকজমকভাবেই।
তবে দীর্ঘ ১০-১২ বছর পার হয়ে গেলেও এই গবেষণা থেকে কোনো কার্যকরী ওষুধ বা চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি। উল্টো এখন তদন্তে বেরিয়ে আসছে, গবেষণার আড়ালে আসলে চলেছে টাকার খেলা।
যেভাবে হয়েছে কোটি টাকার জালিয়াতি
সম্প্রতি এই প্রকল্পের অডিট বা তদন্তে চোখ কপালে ওঠার মতো তথ্য সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, গবেষণাগারে ক্যানসারের ওষুধ তো তৈরি হয়নি, বরং ভুয়া বিল ভাউচার বানিয়ে সরকারি টাকা লুটপাট করা হয়েছে।
তদন্তের প্রধান কিছু অসঙ্গতি:
- গোবর কেনার অস্বাভাবিক বিল: তদন্তে দেখা গেছে, গবেষণার জন্য যে পরিমাণ গোবর ও গোমূত্র কেনা হয়েছে, তার বাজারমূল্য বড়জোর ১৫ থেকে ২০ লাখ রুপি হওয়ার কথা। অথচ নথিপত্রে এই বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৯২ লাখ রুপি! অর্থাৎ প্রায় পৌনে দুই কোটি রুপি শুধুমাত্র গোবর কেনার নামেই গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।
- গবেষণার টাকায় বিলাসিতা: গবেষণার ফান্ডের টাকা ল্যাবরেটরিতে খরচ না করে ব্যক্তিগত বিলাসিতায় খরচ করার প্রমাণ মিলেছে। এই টাকার একটি বড় অংশ দিয়ে নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিলাসবহুল গাড়ি কেনা হয়েছে।
বিমান ভ্রমণে টাকার অপচয়
শুধু গাড়ি বা গোবরের ভুয়া বিল নয়, প্রকল্পের সাথে যুক্ত কর্মকর্তারা ঘনঘন বিমান ভ্রমণেও বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। গবেষণার প্রয়োজনেই এই ভ্রমণ এমন দাবি করা হলেও, এর কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাননি তদন্তকারীরা। সাধারণ মানুষের করের টাকায় এমন বিলাসিতা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি ও জনমনে ক্ষোভ
এত বড় দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও তা সরাসরি অস্বীকার করেছে নানাজি দেশমুখ ভেটেরিনারি সায়েন্স ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ। প্রশাসনের দাবি, প্রতিটি পয়সা নিয়ম মেনেই খরচ করা হয়েছে এবং অডিটে যা বলা হচ্ছে তা সঠিক নয়। তাদের মতে, গবেষণা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া এবং এর ফলাফল আসতে সময় লাগতেই পারে।
তবে সচেতন মহল ও বিজ্ঞানীদের একাংশ বলছেন, ক্যানসারের মতো একটি স্পর্শকাতর ও মারণঘাতী রোগের চিকিৎসার নামে এমন অবৈজ্ঞানিক উপাদান নিয়ে গবেষণা এবং তার আড়ালে অর্থ আত্মসাৎ অপরাধমূলক কাজ। এই ঘটনায় ভারতজুড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান এত দূর এগিয়ে গেছে, সেখানে এমন কুসংস্কারাচ্ছন্ন গবেষণায় কেন কোটি কোটি টাকা ঢালা হলো?








