আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে একটি তেলবাহী জাহাজকে ঘিরে বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ভেনেজুয়েলার সাথে সংশ্লিষ্টতা থাকার অভিযোগে একটি জাহাজ আটক করতে এগিয়ে যাচ্ছে মার্কিন বাহিনী। অন্যদিকে, সেই জাহাজটিকে সুরক্ষা দিতে এবং পাহারায় রাখতে নিজেদের নৌবাহিনী মোতায়েন করেছে রাশিয়া। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।
সাগরের বুকে এই ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, জাহাজটি বর্তমানে স্কটল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের মধ্যবর্তী কোনো এক স্থানে অবস্থান করছে।
আটলান্টিকে মুখোমুখি দুই পরাশক্তি
ঘটনার সূত্রপাত মূলত ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে। মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি, সাগরে ভাসমান ওই জাহাজটি ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। যদিও বর্তমানে জাহাজটি খালি রয়েছে বলে জানা গেছে, তবুও যুক্তরাষ্ট্র এটিকে ছাড় দিতে নারাজ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মাসেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ভেনেজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে প্রয়োজনে ‘নৌ অবরোধ’ বা ন্যাভাল ব্লকেড দেওয়া হবে। এরই অংশ হিসেবে আটলান্টিক মহাসাগরে জাহাজটির পিছু নিয়েছে আমেরিকা। তবে নাটকীয় মোড় নেয় যখন রাশিয়া এই ঘটনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। জাহাজটির নিরাপত্তায় রুশ নৌবাহিনী বা নেভাল ফ্লিট মোতায়েন করা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
নাম ও পতাকা বদলের নাটকীয়তা
সিবিএস নিউজের তথ্যমতে, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ড ক্যারিবীয় সাগরে ‘বেলা ১’ নামের একটি জাহাজে তল্লাশি চালানোর চেষ্টা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা ওয়ারেন্ট অনুযায়ী, ওই জাহাজটি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানের তেল পরিবহন করছিল এবং ভেনেজুয়েলার দিকে যাচ্ছিল।
তবে তল্লাশির আগেই ঘটে এক নাটকীয় ঘটনা। জাহাজটি তার গতিপথ পরিবর্তন করে ফেলে। জানা গেছে, জাহাজটি তার নাম পরিবর্তন করে এখন ‘মারিনেরা’ নাম ধারণ করেছে। শুধু তাই নয়, জাহাজটি গায়ানার পতাকা নামিয়ে সেখানে রাশিয়ার পতাকা উত্তোলন করেছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো জাহাজ রাশিয়ার পতাকা বহন করার অর্থ হলো সেটি রাশিয়ার ভূখণ্ড বা সার্বভৌমত্বের অংশ হিসেবে গণ্য হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান ও প্রস্তুতি
জাহাজটি ইউরোপের দিকে অগ্রসর হওয়ার খবর পাওয়ার পরপরই ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা বেড়ে গেছে। অন্তত ১০টি মার্কিন সামরিক পরিবহন বিমান এবং একাধিক হেলিকপ্টার ওই এলাকায় টহল দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনী যেকোনো মূল্যে জাহাজটিতে উঠতে প্রস্তুত। তারা জাহাজটি ডুবিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সেটিকে জব্দ করতেই বেশি আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় এক বার্তায় জানিয়েছে, তারা নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজ এবং এর সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
খারাপ আবহাওয়া ও অভিযানের চ্যালেঞ্জ
মঙ্গলবার রাতে জাহাজটি স্কটল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের মাঝামাঝি উত্তাল সমুদ্রে অবস্থান করছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে খারাপ আবহাওয়া এবং দীর্ঘ দূরত্বের কারণে মার্কিন বাহিনীর পক্ষে তৎক্ষণাৎ জাহাজটিতে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে যুক্তরাজ্য থেকে কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে হলে ওয়াশিংটনকে অবশ্যই আগে লন্ডনকে অবহিত করতে হবে। তবে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এখনই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক আইন
রাশিয়া এই পুরো ঘটনাটিকে ‘উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ’ করছে বলে জানিয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে যে, জাহাজটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় রাশিয়ার পতাকা নিয়ে এবং সকল আন্তর্জাতিক আইন মেনেই চলাচল করছে।
মস্কোর অভিযোগ, একটি শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো বাহিনী অস্বাভাবিক নজরদারি চালাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল নীতির পরিপন্থী। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পশ্চিমা দেশগুলো মুখে ‘মুক্ত নৌ চলাচলের’ কথা বললেও বাস্তবে তারা নিজেরাই সেই নিয়ম মানছে না।
মাদুরো ইস্যু ও বৈশ্বিক উদ্বেগ
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, ভেনেজুয়েলা সরকার জাহাজ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার ও অবৈধ তেলের ব্যবসা করছে।
মাদুরো আটকের রেশ কাটতে না কাটতেই সাগরে এই তেলবাহী জাহাজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মুখোমুখি অবস্থান বিশ্বজুড়ে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মেরিটাইম গোয়েন্দা সংস্থা কেপলারের বিশ্লেষক দিমিত্রিস আমপাতজিদিসের মতে, জাহাজের নাম বা পতাকা বদলালেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বদলানোর সম্ভাবনা কম। তারা মূলত জাহাজের আন্তর্জাতিক নিবন্ধন নম্বর এবং মালিকানা দেখেই ব্যবস্থা নেবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি








