লাখো মুসল্লির প্রাণের স্পন্দন বিশ্ব ইজতেমা। প্রতি বছর শীতের এই সময়ে টঙ্গীর তুরাগ তীরে ধর্মপ্রাণ মানুষের ঢল নামে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটকে সামনে রেখে বড় ধরনের জনসমাগম এড়াতে চাইছে সরকার। এর পরিপ্রেক্ষিতেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সিদ্ধান্তের মূল কথা হলো নির্বাচনের আগে টঙ্গীর তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) রাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় কী বলা হয়েছে?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে খুব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা এখন রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার। এই কারণে নির্বাচনের আগে টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে কোনো ধরনের বড় সমাবেশ বা জমায়েত করা সম্ভব হবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী বছরের শুরুতেই বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনের জন্য একটি প্রস্তাবনা বা অনুরোধ সরকারের কাছে এসেছিল। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সেই অনুরোধ রক্ষা করতে পারছে না। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে বিশ্ব ইজতেমাসহ নির্বাচনের আগে ওই মাঠে কোনো ধরনের সমাবেশ না করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হলো।
প্রস্তাবিত তারিখ ও সরকারের অবস্থান
ইজতেমা আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে বা সংশ্লিষ্ট মহল থেকে আগামী বছরের জানুয়ারিতে ইজতেমা আয়োজনের একটি খসড়া সময়সীমা ভাবা হয়েছিল। প্রস্তাবনা অনুযায়ী:
- জোড় ইজতেমা (খুরুজ): আগামী বছরের ২ থেকে ৪ জানুয়ারি।
- মূল বিশ্ব ইজতেমা: আগামী বছরের ২২ থেকে ২৪ জানুয়ারি।
সাধারণত মূল ইজতেমার আগে ‘জোড় ইজতেমা’ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে চিল্লায় যাওয়া সাথীরা সমবেত হন এবং ইজতেমার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু সরকারের নির্দেশনার ফলে এই নির্ধারিত তারিখে ইজতেমা বা জোড় কোনোটিই অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। নির্বাচনের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞের ঠিক আগ মুহূর্তে লাখ লাখ মানুষের সমাগম হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই এই সিদ্ধান্ত।
কেন পেছানো হলো বিশ্ব ইজতেমা?
বিশ্ব ইজতেমা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জমায়েত। এখানে কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মুসল্লিরা অংশ নেন। এমন একটি বিশাল আয়োজন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের হাজার হাজার সদস্যকে দিন-রাত পরিশ্রম করতে হয়। অন্যদিকে, জাতীয় নির্বাচনও একটি বিশাল প্রশাসনিক কর্মযজ্ঞ।
১. নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ: নির্বাচনের সময় পুলিশ, র্যাব, আনসারসহ সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও নির্বাচনী পরিবেশ রক্ষায় ব্যস্ত থাকে। একই সময়ে যদি ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়, তবে ইজতেমার নিরাপত্তা বিধান করা কঠিন হয়ে পড়বে।
২. যাতায়াত ও লজিস্টিকস: ইজতেমার সময় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ আশেপাশের এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। নির্বাচনের আগে নির্বাচনী সরঞ্জাম পরিবহন এবং কর্মকর্তাদের যাতায়াতের জন্য রাস্তাঘাট ফাঁকা রাখা জরুরি।
৩. গণভোট ও নির্বাচন: এবারের নির্দেশনায় ‘গণভোট’ বা রেফারেন্ডামের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচন এবং গণভোট উভয় প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হলে বড় ধরনের জনসমাগম এড়িয়ে চলাই শ্রেয় বলে মনে করছে সরকার।
টঙ্গীর তুরাগ তীরের বর্তমান অবস্থা
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর টঙ্গীর তুরাগ তীরের চিত্র এখন অনেকটাই নীরব। সাধারণত এই সময়ে ইজতেমা ময়দান প্রস্তুত করার কাজ শুরু হয়ে যায়। স্বেচ্ছাসেবী ও মুসল্লিরা মাঠ পরিষ্কার, প্যান্ডেল তৈরি এবং অজু-গোসলের স্থান মেরামতের কাজে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু সরকারি নির্দেশনার কারণে এখন সেখানে বড় কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ছে না।
স্থানীয় প্রশাসনকে ইতিমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন নির্বাচনের আগে মাঠে কোনো ধরনের সমাবেশ বা জনসমাগম না হয়। এটি কেবল ইজতেমার জন্য নয়, যেকোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সমাবেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও বিজ্ঞপ্তিতে নির্দিষ্ট করে ইজতেমার কথাই উল্লেখ করা হয়েছে।
ইজতেমা তাহলে কবে হবে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ইজতেমা কি এ বছর হবে না? সরকার কিন্তু ইজতেমা বাতিল করেনি, বরং ‘নির্বাচনের আগে’ করতে বারণ করেছে। এর অর্থ হলো, নির্বাচন এবং গণভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন করে ইজতেমার তারিখ ঘোষণা করা হতে পারে।
সাধারণত জানুয়ারি মাসে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় কারণ ওই সময়ে আবহাওয়া অনুকূলে থাকে। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর যদি ফেব্রুয়ারি মাসে আবহাওয়া এবং পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে, তবে হয়তো তখনই নতুন তারিখ ঘোষণা করা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। মুসল্লিদের এখন অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর।
মুসল্লিদের প্রতিক্রিয়া ও প্রস্তুতি
বিশ্ব ইজতেমার জন্য সারাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন। বিশেষ করে মুরুব্বি এবং চিল্লার সাথীরা এই সময়ের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নেন। হঠাৎ করে ইজতেমা পেছানোর খবরে অনেকের মনে কিছুটা আক্ষেপ তৈরি হলেও, দেশের স্বার্থে এবং নির্বাচনের প্রয়োজনে তারা বিষয়টি মেনে নিচ্ছেন।
অনেক মুসল্লি মনে করেন, ইজতেমা একটি ইবাদতের জায়গা। সেখানে সুষ্ঠু পরিবেশ এবং নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে ইজতেমা হলে মুসল্লিদের আসা-যাওয়ায় কষ্ট হতো এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকতো। তাই নির্বাচন শেষ হলে সুস্থ ও শান্ত পরিবেশে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হওয়াই সবার জন্য মঙ্গলজনক।
বিশ্ব ইজতেমার গুরুত্ব ও ঐতিহ্য
বিশ্ব ইজতেমা তাবলিগ জামাতের বার্ষিক বৈশ্বিক সমাবেশ। ১৯৬৭ সাল থেকে নিয়মিতভাবে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে এই ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। হজ্বের পর এটিই মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত হিসেবে স্বীকৃত। এখানে রাজনৈতিক কোনো আলোচনা হয় না; কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশিত পথে চলার দাওয়াত দেওয়া হয়।
ইজতেমায় আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে লাখো মানুষ ভিড় করেন। দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় হাত তোলেন সবাই। এমন একটি আবেগঘন এবং ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল পরিবেশ। আশা করা যাচ্ছে, নির্বাচনের দামামা থামলে আবারও তুরাগ তীর মুখরিত হবে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে।








