মহাকালের নিয়মেই নক্ষত্রের পতন হয়, কিন্তু কিছু নক্ষত্র রেখে যায় অবিনাশী আলোর রেখা। বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে তেমনই এক ধ্রুবতারা ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। আজ তিনি না ফেরার দেশে। ৮০ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান কেবল একটি ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বিশাল অধ্যায়ের সমাপ্তি।
যিনি ছিলেন একদা একান্তই ঘরকুনো, লাজুক এক গৃহবধূ, কালক্রমে তিনিই হয়ে উঠলেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং কোটি মানুষের ‘দেশনেত্রী’। তাঁর জীবনের এই রূপান্তর কোনো রূপকথার গল্প নয়, বরং এটি ত্যাগ, ধৈর্য এবং ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তার এক বাস্তব দলিল। আজকের এই শোকবিধুর সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা ফিরে দেখতে চাই তাঁর সেই বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ও উত্থানের ইতিহাস।
রাজনীতির আড়ালে এক শান্ত জীবন
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্ম নেওয়া খালেদা খানম পুতুল বড় হয়েছিলেন দিনাজপুরের শান্ত পরিবেশে। ১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যখন তাঁর বিয়ে হয়, তখন তিনি নিতান্তই কিশোরী। বিয়ের পর স্বামীর পোস্টিং সূত্রে ঘুরেছেন পাকিস্তানের নানা শহরে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দুই শিশুসন্তান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকে নিয়ে ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী ছিলেন।
স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান যখন ক্রমান্বয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এলেন, তখনও খালেদা জিয়া ছিলেন পর্দার আড়ালে। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাঁকে খুব একটা দেখা যেত না। স্বামী, সন্তান আর সংসার এই ত্রিভুবনেই সীমাবদ্ধ ছিল তাঁর জগত। জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রপতি, তখনও তিনি নিজেকে রাজনীতি থেকে সযত্নে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। কে জানতো, এই নিভৃতচারী নারীই একদিন হয়ে উঠবেন বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ‘ক্রাউড পুলার’?
শূন্যতা থেকে সাহসের জন্ম (১৯৮১-১৯৮৩)
১৯৮১ সালের ৩০ মে। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে নির্মমভাবে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি পরিবারকে এতিম করেনি, এতিম করেছিল সদ্য গঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকেও। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি যখন শতধা বিভক্ত হওয়ার উপক্রম, দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা তখন দিশেহারা। সাত্তার সরকারের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
বিএনপিকে ভাঙনের হাত থেকে বাঁচাতে এবং দলের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রয়োজন ছিল জিয়া পরিবারের কাউকে। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনুরোধে, বিশেষ করে বিচারপতি সাত্তার এবং অন্যান্যদের আহ্বানে, ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া।
এটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। শোকে মুহ্যমান এক বিধবা নারী, যার কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই, তিনি এসে দাঁড়ালেন ঝড়ের মুখে। ১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের মে মাসে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সেই থেকে শুরু হলো তাঁর এক দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথচলা।
আপোষহীন নেত্রী ও রাজপথের ফিনিক্স (১৯৮৩-১৯৯০)
রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার অভিষেক মোটেও সুখকর ছিল না। তাঁকে লড়তে হয়েছে ঘরের শত্রু এবং বাইরের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অনেক বাঘা বাঘা নেতা যখন আপোষের ফর্মুলা খুঁজছেন, খালেদা জিয়া তখন ছিলেন অটল। ১৯৮৬ সালের পাতানো নির্বাচনে যখন অন্য দলগুলো অংশ নিয়েছিল, খালেদা জিয়া তখন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন, “স্বৈরাচারের অধীনে কোনো নির্বাচনে বিএনপি যাবে না।”
তাঁর এই একটি সিদ্ধান্তই তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। তিনি হয়ে ওঠেন ‘আপোষহীন নেত্রী’। পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, গৃহবন্দিত্ব কোনোকিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত দীর্ঘ নয় বছর তিনি চষে বেড়িয়েছেন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। তাঁর গাড়িবহরে হামলা হয়েছে, তিনি বারবার গ্রেফতার হয়েছেন, কিন্তু রাজপথ ছাড়েননি। ছাত্র-জনতা তাঁর মধ্যে দেখেছিল জিয়াউর রহমানের ছায়া এবং এক নির্ভীক মায়ের প্রতিচ্ছবি।
গণতন্ত্রের বিজয় ও প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী (১৯৯১-১৯৯৬)
দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯০ সালে এরশাদের পতন হয়। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত হয় দেশের ইতিহাসের অন্যতম নিরপেক্ষ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে সব জল্পনা-কল্পনা ও জরিপ ভুল প্রমাণ করে জয়লাভ করে বিএনপি। এবং এই জয়ের একমাত্র কারিগর ছিলেন খালেদা জিয়া।
১৯৯১ সালের ২০ মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তাঁর হাত ধরেই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তিত হয়। তাঁর প্রথম শাসনামলে তিনি দ্বাদশ সংশোধনী পাস করে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কমিয়ে সংসদীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেন। নারী শিক্ষা অবৈতনিক করা, কোস্টাল বেল্টে বনায়ন এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে দেশকে এগিয়ে নেওয়া ছিল তাঁর সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
তবে মাগুরা উপ-নির্বাচনের বিতর্ক এবং পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন তাঁর প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬-এর বিতর্কিত নির্বাচনের পর তিনি স্বল্প সময়ের জন্য দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে সংযুক্ত করে পদত্যাগ করেন। এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার একটি পরীক্ষা।
বিরোধী দল থেকে ফের ক্ষমতায় (১৯৯৬-২০০৬)
১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে এবং বিএনপি ইতিহাসে বৃহত্তম বিরোধী দল হিসেবে সংসদে বসে। বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়।
২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোট গঠন করে তিনি নির্বাচনে অংশ নেন। সেই নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। খালেদা জিয়া তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর এই মেয়াদে বাংলাদেশে অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হলেও, জঙ্গিবাদের উত্থান এবং হাওয়া ভবনের কথিত প্রভাব সরকারের ভাবমূর্তিকে কিছুটা ক্ষুণ্ন করে। তবুও, তিনি কঠোর হাতে জেএমবি শায়খ আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাইদের মতো জঙ্গিদের দমন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
১/১১ এবং মাইনাস টু ফর্মুলা
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দেশে যে রাজনৈতিক অরাজকতা সৃষ্টি হয়, তার ফলশ্রুতিতে আসে ১/১১-এর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এবং বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু খালেদা জিয়া ছিলেন অনড়। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন, “বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এ দেশই আমার ঠিকানা। মরলে এ দেশেই মরব।” তাঁর এই দেশপ্রেম এবং অনড় অবস্থান তৃণমূল নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় সরকার।
একাকিত্বের সংগ্রাম ও শেষ জীবন (২০০৮-২০২৫)
২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি বিরোধী দলীয় নেতা হন। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া সব মিলিয়ে বিএনপির জন্য সময়টা ছিল কঠিন।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি কারাগারে যান। নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে অসুস্থ শরীরে তিনি দিন কাটিয়েছেন। এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে করুণ অধ্যায়। যিনি একসময় পুরো দেশ শাসন করেছেন, তাঁকে কাটাতে হয়েছে একাকী বন্দী জীবন।
২০২০ সালে নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি পেলেও তিনি ছিলেন কার্যত গৃহবন্দী। ফিরোজার চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তাঁর পৃথিবী। এর মধ্যে তিনি হারিয়েছেন ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে, বড় ছেলে তারেক রহমান নির্বাসিত। স্বামী নেই, সন্তান নেই এক বিশাল শূন্যতা নিয়ে তিনি লড়াই করেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।
অপরাজিত কিংবদন্তি
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর ‘অপরাজিত’ তকমা। তিনি তাঁর জীবনে ফেনী, বগুড়া, ঢাকা, খুলনা যেখান থেকেই নির্বাচন করেছেন, সেখানেই জয়লাভ করেছেন। ১৯৯১ সালে ৫টি, ১৯৯৬ সালে ৫টি এবং ২০০১ সালে ৫টি আসনে দাঁড়িয়ে সবকটিতে জয়ী হওয়ার বিরল রেকর্ড একমাত্র তাঁরই। এটি প্রমাণ করে, তিনি ছিলেন মাটির ও মানুষের নেত্রী।
একটি যুগের অবসান
৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি যুগের অবসান হলো। তিনি কেবল বিএনপির নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মানসকন্যা। তাঁর ভুল-ত্রুটি হয়তো ছিল, কিন্তু দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং গণতন্ত্রের জন্য তাঁর ত্যাগ ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
গৃহবধূ পুতুল থেকে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া এই যাত্রাপথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে ধসে পড়ার পরেও উঠে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে প্রবল প্রতাপশালী স্বৈরাচারের চোখের দিকে তাকিয়ে ‘না’ বলতে হয়।
আজ তিনি নেই। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, তাঁর দল এবং তাঁর ‘আপোষহীন’ চেতনা আগামী দিনেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে। ইতিহাসের পাতায় তিনি বেঁচে থাকবেন একজন ‘ফাইটার’ হিসেবে, যিনি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত হার মানেননি।
বিদায়, হে রাজনীতির মহাকাব্যিক নায়িকা।








