হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
Thursday, September 24, 2026
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeআর্ন্তজাতিকসিরিয়ায় জুমার নামাজ চলাকালে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত ৮
spot_img

সিরিয়ায় জুমার নামাজ চলাকালে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত ৮

যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় আবারও রক্তঝরা এক জুমার দিন দেখল বিশ্ব। দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় শহর হোমসে জুমার নামাজের সময় একটি মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে ঘটনাস্থলেই অন্তত আটজন মুসল্লি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৮ জন। পবিত্র প্রার্থনার সময় এমন ন্যাক্কারজনক হামলায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছে স্থানীয় জনজীবন।

শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) সিরিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই হতাহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে আহতের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবং কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রক্তে রঞ্জিত পবিত্র জুমার দিন

সপ্তাহের সবচেয়ে পবিত্র দিন হিসেবে মুসলিম বিশ্বে শুক্রবার বা জুমার দিনটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। মানুষ যখন সৃষ্টিকর্তার ইবাদতে মগ্ন, ঠিক তখনই এই নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে। সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিবৃতি অনুযায়ী, বিস্ফোরণটি ঘটেছে হোমসের ওয়াদি আল-ধাহাব এলাকার আল-খোদারি স্ট্রিটে অবস্থিত ‘ইমাম আলি ইবনে আবি তালিব’ মসজিদে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জামাতের ঠিক পরপরই বিকট শব্দে বিস্ফোরণটি ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে মসজিদের ভেতর ধুলো আর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে মুসল্লিদের আর্তনাদ। পবিত্র স্থানের মেঝে ভিজে যায় সাধারণ মানুষের রক্তে।

জরুরি পরিস্থিতি: সিরিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জরুরি ও অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা পরিচালক নাজিব আল-নাসান জানিয়েছেন, “ঘটনাস্থল থেকে হতাহতদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। আমাদের মেডিকেল টিম সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে, তবে মৃতের সংখ্যা বাড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।”

নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও উদ্ধার অভিযান

বিস্ফোরণের খবর পাওয়া মাত্রই সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ ইউনিটগুলো ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। পুরো এলাকাটি কর্ডন করে রাখা হয়েছে। সাধারণ মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে যাতে তদন্তের আলামত নষ্ট না হয়। একইসাথে ফায়ার সার্ভিস এবং অ্যাম্বুলেন্স কর্মীরা ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে আহতদের উদ্ধারে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এটি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে প্রাথমিক আলামত দেখে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, এটি একটি শক্তিশালী ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (IED) বা পূর্বপরিকল্পিত বোমা হামলা হতে পারে।

সরকারি প্রতিক্রিয়া ও দোষীদের হুঁশিয়ারি

এই হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সিরিয়া সরকার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে ‘কাপুরুষোচিত কর্মকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করে,

“এই হামলা কেবল মানুষের প্রাণই কেড়ে নেয়নি, এটি মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের ওপর এক নগ্ন আঘাত। সিরিয়া যখন স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে, তখন দেশকে পুনরায় অস্থিতিশীল করার হীন উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছে।”

সিরিয়া সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, এই জঘন্য অপরাধের সাথে যারা জড়িত, তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে এবং উপযুক্ত জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা হবে। এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী বা সংগঠন এই হামলার দায় স্বীকার করেনি।

হোমস: সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু থেকে শান্তির খোঁজ

সিরিয়ার মানচিত্রে হোমস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর। একসময় একে ‘বিপ্লবের রাজধানী’ বলা হতো। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সময় এই শহরটি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হয়েছে। তবে গত কয়েক বছরে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে এখানে তুলনামূলক শান্তি বিরাজ করছিল। মানুষ তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিল।

দীর্ঘদিন পর এমন একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ শহরবাসীকে আবারও আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ভয় পাচ্ছেন যে, হয়তো আবারও সেই পুরনো সংঘাতময় দিনগুলো ফিরে আসছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হতে পারে যা সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য করা হয়েছে।

হামলার লক্ষ্যবস্তু কেন মসজিদ?

ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা চালানো সন্ত্রাসীদের একটি পুরনো কৌশল। এর পেছনে সাধারণত দুটি উদ্দেশ্য কাজ করে: 

১. সর্বোচ্চ প্রাণহানি: জুমার নামাজের সময় মসজিদে প্রচুর মানুষ সমবেত হন, তাই অল্প পরিশ্রমে বড় ধরনের ক্ষতি করা সম্ভব হয়। 

২. সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দেওয়া: ধর্মীয় স্থানে আঘাত হেনে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও উদ্বেগ

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ অনেকটা স্তিমিত হয়ে এলেও মাঝেমধ্যেই এমন চোরাগোপ্তা হামলা আন্তর্জাতিক মহলকে ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সিরিয়ার স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। টিআরটি ওয়ার্ল্ড-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ধরনের হামলা প্রমাণ করে যে সিরিয়ায় এখনো বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী বা সন্ত্রাসী স্লিপার সেল সক্রিয় রয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলছে, যুদ্ধের কোনো নিয়মেই উপাসনালয়ে হামলা সমর্থনযোগ্য নয়। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

আহাজারি থামছে না স্বজনদের

হোমসের হাসপাতালগুলোর সামনে এখন শুধুই কান্নার রোল। কেউ তার বাবাকে হারিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন সন্তানকে। আহতদের স্বজনরা ছুটছেন রক্তের সন্ধানে। স্থানীয় প্রশাসন রক্তদাতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের অনেকের শরীরেই স্প্লিন্টার ঢুকে গেছে। কয়েকজনকে জরুরি অস্ত্রোপচার করতে হচ্ছে। নিহতের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া

হোমসের সাধারণ মানুষ এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ ও শোকাহত। স্থানীয় এক বাসিন্দা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম, যুদ্ধ করতে নয়। আল্লাহর ঘরেও যদি আমরা নিরাপদ না থাকি, তবে কোথায় যাব? যারা এই কাজ করেছে তারা মানুষ হতে পারে না।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই ঘটনার প্রতিবাদে ঝড় উঠেছে। সিরিয়ার নাগরিকরা হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন। তারা বলছেন, দীর্ঘ যুদ্ধের পর তারা এখন শান্তি চান, আর কোনো মায়ের কোল খালি হোক তা তারা চান না।

পরবর্তী পদক্ষেপ

সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, তারা সিসিটিভি ফুটেজ এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করছে। আশেপাশের এলাকায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। এই হামলার পেছনে বিদেশি কোনো শক্তির ইন্ধন আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকার জনগণকে শান্ত থাকার এবং গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

আগামী দিনগুলোতে সিরিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মসজিদ এবং জনসমাগমপূর্ণ এলাকাগুলোতে বাড়তি সতর্কতা জারি করা হতে পারে।


মসজিদের মতো পবিত্র স্থানে এমন বর্বরোচিত হামলা প্রমাণ করে সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম নেই, তাদের কোনো মানবিকতা নেই। সিরিয়ার জনগণ দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধের বিভীষিকা সহ্য করেছে। এখন যখন তারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন এমন আঘাত সত্যিই মর্মান্তিক। বিশ্ববাসী আশা করছে, সিরিয়া সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে দোষীদের খুঁজে বের করবে এবং এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য লাভের প্রার্থনায় এখন মগ্ন পুরো সিরিয়া।

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!