গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের চলমান সামরিক অভিযানের প্রভাবে অস্ট্রেলিয়ায় মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশটিতে সশরীরে মুসলিমবিদ্বেষী হামলা ১৫০ শতাংশ এবং অনলাইনে এই হার ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খোদ অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ।
প্রতিবেদনের মূল তথ্য ও ভয়াবহ পরিসংখ্যান
অস্ট্রেলিয়া সরকারের নিযুক্ত বিশেষ দূত আফতাব মালিক শুক্রবার সিডনিতে এই ৬০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি পেশ করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে অস্ট্রেলিয়ায় মুসলিমদের লক্ষ্য করে ঘৃণা ছড়ানোর প্রবণতা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
- অনলাইন বিদ্বেষ: ইন্টারনেটে মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণা এবং আক্রমণ বেড়েছে ২৫০ শতাংশ।
- সশরীরে আক্রমণ: জনসমক্ষে বা সরাসরি মুসলিমদের হেনস্তা করার ঘটনা বেড়েছে ১৫০ শতাংশ।
- নারীদের নিরাপত্তা: প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুসলিম নারী ও শিশুরা তাদের পোশাক এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজের প্রতিক্রিয়া
সিডনিতে মিডিয়া ব্রিফিংকালে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ বলেন, “ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে অস্ট্রেলীয়দের লক্ষ্যবস্তু করা আমাদের দেশের মূল মূল্যবোধের ওপর আঘাত। প্রতিটি অস্ট্রেলীয়র নিজ নিজ সম্প্রদায়ে নিরাপদ বোধ করার অধিকার রয়েছে। আমাদের সমাজ থেকে ঘৃণা, ভয় এবং কুসংস্কার দূর করতে হবে যা বিভাজন সৃষ্টি করে।”
তিনি আরও জানান, তার সরকার এই স্বাধীন প্রতিবেদনের ৫৪টি সুপারিশ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে।
বিশেষ দূত আফতাব মালিকের পর্যবেক্ষণ
গত অক্টোবর থেকে মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনা মোকাবিলায় সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে কাজ করছেন আফতাব মালিক। তিনি জানান, অস্ট্রেলিয়ায় মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনা এতটাই স্বাভাবিক (Normalize) হয়ে গেছে যে, অনেক সময় আক্রান্তরা অভিযোগ করার প্রয়োজনও বোধ করেন না।
আফতাব মালিক বলেন, “বাস্তবতা হলো অস্ট্রেলিয়ায় মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনা দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান ছিল, যা কখনো উপেক্ষা করা হয়েছে আবার কখনো অস্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু এটি কখনোই পুরোপুরি মোকাবিলা করা হয়নি। আমরা দেখছি প্রকাশ্যে গালিগালাজ, গ্রাফিতি এবং মুসলিম নারীদের হিজাব বা পোশাকের কারণে হেনস্তা করা হচ্ছে।”
প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ সমূহ
ভবিষ্যতে মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনা প্রতিরোধে প্রতিবেদনে ৫৪টি সুপারিশ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:
১. কাউন্টার-টেররিজম আইন পর্যালোচনা: বৈষম্য রুখতে বিদ্যমান সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনগুলো খতিয়ে দেখা।
২. বিস্তৃত তদন্ত: মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনা মূল কারণ এবং সরকারি নীতিতে কোনো বৈষম্য রয়েছে কি না তা অনুসন্ধানে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন।
৩. নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: মুসলিম সম্প্রদায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা।
ইউরোপ ও বিশ্ব প্রেক্ষাপটে মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনা কেবল অস্ট্রেলিয়ায় নয়, বরং ইউরোপজুড়েও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ডানপন্থী এবং অভিবাসীবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থানের ফলে এই প্রবণতা আরও প্রকট হচ্ছে। এর আগে ফ্রান্স, স্পেন এবং যুক্তরাজ্যেও মুসলিমবিদ্বেষী হামলার খবর পাওয়া গেছে।
অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম জনসংখ্যা
২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যার ৩.২ শতাংশ মুসলিম। স্বল্পসংখ্যক এই জনগোষ্ঠীর ওপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণ দেশটির সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া সরকার ইতিমধ্যে মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনার পাশাপাশি অ্যান্টি-সেমিটিজম (ইহুদিবিদ্বেষ) মোকাবিলায়ও পৃথক দূত নিয়োগ করেছে। তবে বর্তমান প্রতিবেদনটি প্রমাণ করে যে, গাজা যুদ্ধের প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সুদূর অস্ট্রেলিয়ার জনজীবনেও অস্থিরতা তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের পদক্ষেপগুলো মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তার বোধ ফিরিয়ে আনতে কতটা কার্যকর হয়।
সূত্র: আল জাজিরা








