ক্রিকেট এমনই একটি খেলা যেখানে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কিছুই বলা যায় না। যত বড় লক্ষ্যই হোক বা যত শক্তিশালী প্রতিপক্ষই হোক, প্রতিটি বলেই ভাগ্য পরিবর্তনের সুযোগ রাখে ক্রিকেট। আর সেই কথার বাস্তব উদাহরণ হয়ে রইল এসিসি রাইজিং স্টার্স টুর্নামেন্টের সেমিফাইনাল, যেখানে ভারত ‘এ’ দলের বিরুদ্ধে নাটকীয় এক ম্যাচে সুপার ওভার জয় পেয়ে ফাইনালে জায়গা করে নিল বাংলাদেশ ‘এ’ দল। ম্যাচে উত্থান-পতন, উত্তেজনা, ভুল, রোমাঞ্চ কিছুই বাদ ছিল না। প্রথম ইনিংসের ব্যাটিং ঝড়, এরপর উত্তপ্ত বোলিং, ক্যাচ মিস, অবিশ্বাস্য রানের তাড়া এবং সবশেষে সুপার ওভারের রুদ্ধশ্বাস সিদ্ধান্ত ম্যাচটিকে নিয়ে গিয়েছিল নতুন উচ্চতায়।
উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ে নতুন ইতিহাস
শুক্রবার কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত ম্যাচটির শুরু ছিল আগ্রাসী ব্যাটিং দিয়ে। টস হেরে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ শুরু থেকেই ঝড় তোলে। বিশেষ করে ওপেনার হাবিবুর রহমান সোহানের দুর্দান্ত সময়োপযোগী ইনিংস দলকে এগিয়ে নিয়ে যায়। শুরু থেকেই চার-ছক্কার বন্যা বইয়ে তিনি স্কোরবোর্ড সচল রাখেন। তবে ইনিংস এগোতে গিয়ে কিছু উইকেট দ্রুত পতন হওয়ায় চাপ সৃষ্টি হয় দলের ওপর। কিন্তু পরে এসএম মেহেরব যখন ক্রিজে আসেন, তখন ম্যাচের ছবিই বদলে যায়। আগের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে বড় ইনিংস না থাকলেও ওই ম্যাচে তিনি দেখালেন নিজের লুকিয়ে থাকা শক্তি। মাত্র কয়েক ওভারেই চার-ছক্কা মেরে তিন অঙ্কের কাছে নিয়ে যান দলকে।
বাংলাদেশের শক্তিশালী সংগ্রহ
বাংলাদেশ ২০ ওভারে সংগ্রহ করে ১৯৪ রান। এই লক্ষ্য তাড়াতে নেমে ভারত ‘এ’ দল শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক খেলার চেষ্টা করে। ওপেনার বৈভব সুরিয়াভানশি এবং প্রিয়ানশ আরিয়া কেবল ৩.১ ওভারে ৫৩ রান তুলে ম্যাচকে এনে দেন রোমাঞ্চকর অবস্থায়। বাংলাদেশি বোলাররা তখন কিছুটা চাপে পড়লেও ধীরে ধীরে ম্যাচে ফেরে বাংলাদেশ। আবু গাফফার সাকলাইনের স্লোয়ারে গুরুত্বপূর্ণ উইকেট পড়ে ভারত শিবিরে। তবে এরপরও ম্যাচের মোমেন্টাম কখনো ভারতের দিকে, কখনো বাংলাদেশের দিকে ঘুরতে থাকে।
আকবর আলির ভুলে ম্যাচ সুপার ওভারে
শেষ ওভারে ভারতের প্রয়োজন ছিল ১৬ রান। রিপন মন্ডল বল হাতে দারুণ প্রতিরোধে ওভারটি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছিলেন। একসময় দুই রান অস্বাভাবিক মনে হলেও চাপে পড়ে বাংলাদেশ দল ফিল্ডিংয়ে ভুল করে বসে। শেষ বলে ব্যাটসম্যান মাত্র একটি রান নিলে ম্যাচ জয়ের সুযোগ ছিল। কিন্তু উইকেটকিপার আকবর আলি স্টাম্পে বল মারতে গিয়ে ভুল করে ফেলেন। বল হাতে থাকা অবস্থায় তাড়াহুড়ো করে ভুল থ্রো করে ফেলেন। বল স্টাম্প ফস্কে গেলে ব্যাটসম্যানরা অতিরিক্ত আরও দুই রান নিয়ে ম্যাচ টাই করে ফেলেন। ফলে ম্যাচ গড়ায় সুপার ওভারে।
সুপার ওভার: নিঃশ্বাস বন্ধ করা উত্তেজনা
সুপার ওভারে রিপন মন্ডল বল হাতে প্রতিনিধিত্ব করেন বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে। ওভারের প্রথম বলেই রিভার্স স্কুপ করতে গিয়ে ভারত ‘এ’ অধিনায়ক জিতেশ বোল্ড হন। পরের বলেও আরও একটি উইকেট পড়ে। ভারতের ইনিংস মাত্র দুই বলেই শূন্যে থেমে যায়। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল মাত্র একটি রান। কিন্তু উত্তেজনা এখানেই শেষ হয়নি। ইয়াসির আলি প্রথম বলেই উড়িয়ে মারেন, কিন্তু সীমানায় দুর্দান্ত ক্যাচে তিনি আউট হন। তারপর ব্যাটে আসেন আকবর আলি। দ্বিতীয় বলটি ছিল গুগলি। কিন্তু বলটি লাইন পার করে গেলে আম্পায়ার ওয়াইড দেন। আর সেই একটি ওয়াইড বলেই নির্ধারিত হয় ম্যাচের ফল। বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা তখন উল্লাসে মেতে ওঠে।
ম্যাচের শুরুতে বাংলাদেশের ব্যাটিং আক্রমণ
বাংলাদেশ ‘এ’ দলের ইনিংস শুরু হয় আগ্রাসী ব্যাটিং দিয়ে। প্রথম চার ওভারে দল সংগ্রহ করে ৪৩ রান। ওপেনার জিসান আলম মাত্র ১৪ বলে ২৬ রান করেন। অন্যদিকে তিন নম্বর জাওয়াদ আবরার ও অধিনায়ক আকবর আলি ব্যাট হাতে বড় ভূমিকা রাখতে না পারলেও ইনিংস এগিয়ে নিয়ে যান হাবিবুর রহমান সোহান। মাত্র ৩২ বলে ফিফটি করে তিনি নিশ্চিত করেন যে দল শেষ পর্যন্ত সম্মানজনক স্কোরে পৌঁছাতে পারবে। সোহান আউট হওয়ার পর ইনিংস কিছুটা ধীর হয়ে গেলেও শেষ দিকে মেহেরব ক্যাচিং জোনে আগুন লাগিয়ে দেন।
মেহেরবের ঝড়
১৯তম ওভারে নামান ধিরের বোলিংয়ে চারটি ছক্কা ও একটি চার মেরে মেহেরব একাই সংগ্রহ করেন ২৮ রান। আবার শেষ ওভারে ইয়াসির আলি ও মেহেরব মিলে তোলেন আরও রান। ম্যাচ শেষে মেহেরব অপরাজিত থাকেন ৪৮ রানে। এই ইনিংসই ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেয়। ব্যাটিংয়ের আত্মবিশ্বাস আরো বাড়ায় বাংলাদেশ ‘এ’ দল সুপার ওভারের আগে নিজেদের শক্তিশালী মনে করে।
ভারতের জবাব: শুরুতে আগ্রাসন, পরে চাপ
ভারতের ব্যাটাররা শুরু থেকেই রানের ঝড় তোলেন। প্রিয়ানশ আরিয়া ও বৈভব সুরিয়াভানশি বাংলাদেশি বোলারদের ওপর চড়াও হন। কিন্তু রান তোলার সঙ্গে সঙ্গে উইকেট হারাতেও থাকে ভারত। প্রিয়ানশ যদিও ২৩ বলে ৪৪ রান করেন, তবু ম্যাচের পরিস্থিতি সব সময় বদলাতে থাকে।
শেষদিকে উত্তেজনা ও রিপনের লড়াই
ম্যাচের শেষ মুহূর্তের পুরো ক্রেডিটই পাওয়া উচিত রিপন মন্ডলের। নিজের শেষ দুই ওভারে ওভারপ্রতি রান নিয়ন্ত্রণ করে ম্যাচে বাংলাদেশের আশা জাগিয়ে তুলেছিলেন তিনি। শেষ ওভারের নাটকীয়তা সত্ত্বেও সুপার ওভার এবং ম্যাচসেরা পুরস্কার যায় তার ঝুলিতে।
ম্যাচের সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ ‘এ’: ২০ ওভারে ১৯৪/৬
সোহান ৬৫, জিসান ২৬, মেহেরব ৪৮*, ইয়াসির ১৭*
ভারত ‘এ’: ২০ ওভারে ১৯৪/৬
সুরিয়াভানশি ৩৮, প্রিয়ানশ ৪৪, জিতেশ ৩৩, ওয়াধেরা ৩২*
ফল: ম্যাচ টাই, সুপার ওভারে বাংলাদেশ জয়।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: রিপন মন্ডল
এই ম্যাচটি শুধু একটি ক্রিকেট ম্যাচ ছিল না, বরং নতুন একটি গল্প, নতুন উজ্জীবন এবং তরুণ ক্রিকেটারদের সম্ভাবনা দেখিয়ে দেওয়ার চোখধাঁধানো উদাহরণ হয়ে রইল। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং, চাপ, ভুল, সাফল্য সব মিলিয়ে ক্রিকেটের রোমাঞ্চের সর্বোচ্চ স্বাদ উপহার দিল দুই দল। কিন্তু দিনের শেষে হাসিমুখে মাঠ ছাড়ল বাংলাদেশ ‘এ’ দল, যারা এই জয়ে ফাইনালে পা রেখে দেশের জন্য আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।








