সংঘাতের সূত্রপাত: এক ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার ঘটনা
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (জাবিপ্রবি) মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক নজিরবিহীন সংঘর্ষের সাক্ষী হলো। একটি নারী শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্ত করার মতো স্পর্শকাতর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয় গ্রামবাসী ও আমবটতলা বাজারের ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এই সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ২৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
মোবাইল দোকানের দোকানির বিরুদ্ধে অভিযোগ
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সংঘাতের সূচনা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটবর্তী আমবটতলা বাজারে। কেমিকৌশল বিভাগের একজন নারী শিক্ষার্থী একটি প্রজেক্টের কাজে স্থানীয় একটি মোবাইল ফোনের দোকানে গিয়েছিলেন। অভিযোগ ওঠে, সেই দোকানের মালিক বা দোকানি তাকে উত্ত্যক্ত করেন এবং আপত্তিকর মন্তব্য করেন।
প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে সংঘাতের শুরু
ওই নারী শিক্ষার্থী দ্রুতই ঘটনাটি তার সহপাঠীদের জানান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী দলবদ্ধভাবে সেই দোকানে গিয়ে দোকানির কাজের প্রতিবাদ করেন।
একপর্যায়ে প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীরা সেই দোকানিকে মারধর শুরু করলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বাজারের অন্যান্য ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় গ্রামবাসী দোকানির পক্ষ নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় এবং তাদের ধরে পিটুনি দেয়। এই মারধরের ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে শিক্ষার্থী ও গ্রামবাসীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের রূপ নেয়।
রণক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুপস্থিতি
সংঘাত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীরা এবং স্থানীয় গ্রামবাসী উভয় পক্ষই ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং ঢিল ছোড়াছুড়ি শুরু করে। পরিস্থিতি এমন হয় যে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টোরিয়াল বডি বা প্রক্টরের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা দল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
গ্রামবাসীর রাস্তা অবরোধ ও অগ্নিসংযোগ
সংঘর্ষ চলাকালীন গ্রামবাসীর একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাস্তা অবরোধ করে এবং রাস্তার ওপর বিভিন্ন জিনিসপত্র জড়ো করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই অবরোধের ফলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং উত্তেজনা আরও বাড়ে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দেরিতে আসা নিয়ে ক্ষোভ
সংঘর্ষ শুরু হওয়ার তিন ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও ঘটনাস্থলে কোনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী (পুলিশ বা অন্যান্য) উপস্থিত হয়নি বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে যায় এবং শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপর চরম ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মো. ওমর ফারুক জানান, “আমরা প্রক্টোরিয়াল বডিসহ অনেক শিক্ষক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আসতে দেরি করায় পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে যায়।”
উপাচার্য অবরুদ্ধ: শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও দাবি
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সংঘর্ষের একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আব্দুল মজিদ, কোষাধ্যক্ষ (ট্রেজারার) এবং প্রক্টোরিয়াল টিমের সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন।
সেনা ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ
রাত ৯টার পরে, দীর্ঘ সময় পর, সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা অবশেষে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তাদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সেখানে আসেন এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। সেনাবাহিনী ও পুলিশের হস্তক্ষেপে মূলত সংঘাতটি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং রাস্তা থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
মেডিকেল সেন্টারে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা
সংঘর্ষ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে যান উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। কিন্তু সেখানে থাকা বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তাদের উপর আগে থেকেই জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন।
- শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের কারণ: আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দেরিতে আসা, প্রক্টোরিয়াল বডির ব্যর্থতা এবং বারবার উত্ত্যক্তকরণের ঘটনায় প্রশাসনের দুর্বলতা।
- দাবি: বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তখন উপাচার্যসহ প্রক্টোরিয়াল বডির পদত্যাগের দাবি তুলে তাদের অবরুদ্ধ করেন।
বর্তমানে সেনাবাহিনী ও পুলিশের উপস্থিতিতে পরিস্থিতি আপাত শান্ত থাকলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও উত্তেজনা এখনো বিদ্যমান। এই ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা এবং ছাত্র-জনতার সম্পর্ক নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। কর্তৃপক্ষকে দ্রুত এই সংঘাতের মূল কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।








