হোয়াটসঅ্যাপ বর্তমান যুগের অন্যতম জনপ্রিয় যোগাযোগের মাধ্যম। প্রিয়জনের সাথে চ্যাটিং থেকে শুরু করে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সবই আদান-প্রদান হয় এই প্ল্যাটফর্মে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, অপর প্রান্তের মানুষটি আপনাকে কোনো মেসেজ পাঠিয়েই আবার তা ‘ডিলিট ফর এভরিওয়ান’ করে দিয়েছেন। আর চ্যাট বক্সে ভেসে উঠছে কেবল একটি লেখা “This message was deleted”।
এমন মুহূর্তে কৌতূহলের শেষ থাকে না! মনে হাজারো প্রশ্ন জাগে “কী ছিল ওই মেসেজে? ভুল করে পাঠাল, নাকি গোপন কোনো কথা লিখে মুছে দিল?” বিশেষ করে মেসেজটি যদি প্রিয় কোনো মানুষের হয়ে থাকে, তবে তো আফসোসের সীমা থাকে না।
হোয়াটসঅ্যাপ তাদের অ্যাপে সরাসরি এই মুছে ফেলা মেসেজ দেখার কোনো বোতাম বা অপশন রাখেনি। তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। সঠিক কৌশল জানা থাকলে অ্যান্ড্রয়েড বা আইফোনে মুছে ফেলা সেই চ্যাট আবার পড়ে নেওয়া সম্ভব। চলুন জেনে নেওয়া যাক হোয়াটসঅ্যাপের ডিলিট হওয়া মেসেজ দেখার উপায় এবং এর সহজ নিয়মগুলো।
১. নোটিফিকেশন হিস্টোরি ব্যবহার করা (অ্যান্ড্রয়েড ফোন)
অ্যান্ড্রয়েড ফোনের নোটিফিকেশন হিস্টোরি হলো একটি দারুণ ফিচার, যা ফোনের সব আসা মেসেজের নোটিফিকেশন জমিয়ে রাখে। অপরজন মেসেজটি মুছে ফেলার আগেই যদি ফোনে সেটি নোটিফিকেশন আকারে এসে থাকে, তবে তা নোটিফিকেশন লগে সংরক্ষিত হয়ে যায়।
কীভাবে চালু করবেন?
- আপনার ফোনের Settings-এ যান।
- Notifications অথবা Apps & Notifications অপশনে ঢুকুন।
- সেখানে থাকা Notification History অপশনটি খুঁজে বের করে ON বা চালু করে দিন।
এখন থেকে কেউ মেসেজ পাঠিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ডিলিট করে দিলেও আপনি সরাসরি নোটিফিকেশন হিস্টোরিতে গিয়ে সেই মেসেজের কিছু অংশ বা পুরোটা পড়ে নিতে পারবেন। তবে মনে রাখবেন, এই ফিচারটি মেসেজ আসার আগেই চালু থাকতে হবে।
২. চ্যাট ব্যাকআপ থেকে মেসেজ পুনরুদ্ধার (Restore)
আপনার হোয়াটসঅ্যাপের প্রতিদিনের বা সাপ্তাহিক ব্যাকআপ সুবিধা চালু থাকলে মুছে যাওয়া চ্যাট ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
কাজের ধাপসমূহ:
১. প্রথমে হোয়াটসঅ্যাপের Settings > Chats > Chat Backup-এ গিয়ে দেখুন শেষ ব্যাকআপ কবে ও কখন নেওয়া হয়েছে।
২. যদি সেই সময়টি মেসেজ মুছে ফেলার আগের হয়, তবে আপনার ফোন থেকে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাপটি আনইনস্টল (Uninstall) করে দিন।
৩. এবার প্লে-স্টোর বা অ্যাপ স্টোর থেকে অ্যাপটি পুনরায় ইনস্টল করুন।
৪. ফোন নম্বর দিয়ে ভেরিফাই করার পর চ্যাট Restore করার একটি অপশন দেখতে পাবেন। সেখানে ‘Restore’ চাপলেই পুরোনো ডিলিট হওয়া চ্যাটগুলো আবার ফিরে আসবে।
সতর্কতা: ব্যাকআপ নেওয়ার পর যেসব নতুন মেসেজ এসেছিল, রিস্টোর করলে সেগুলো কিন্তু মুছে যেতে পারে।
৩. চ্যাট এক্সপোর্ট (Export Chat) করে রাখা
ভবিষ্যতে চ্যাটের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হারিয়ে যাওয়া বা ডিলিট হওয়া থেকে বাঁচতে আপনি আগে থেকেই যেকোনো চ্যাটের ব্যাকআপ ফাইল হিসেবে ‘এক্সপোর্ট’ করে নিজের কাছে সেভ রাখতে পারেন।
কীভাবে করবেন?
- যে চ্যাটটি নিরাপদ রাখতে চান, সেটির চ্যাট বক্স খুলুন।
- ডান পাশের থ্রি-ডট (Three-dot) মেনুতে ট্যাপ করে More > Export Chat অপশন বেছে নিন।
- এবার মিডিয়া ফাইলসহ বা মিডিয়া ছাড়া চ্যাটটি ই-মেইল, গুগল ড্রাইভ বা অন্য যেকোনো জায়গায় সেভ করে রাখুন। এতে মূল চ্যাট থেকে মেসেজ ডিলিট হলেও আপনার এক্সপোর্ট ফাইলে তা রয়ে যাবে।
৪. রিপ্লাই বা কোট করা মেসেজ দেখা
অনেক সময় হোয়াটসঅ্যাপের সাধারণ কিছু ফিচারের মাধ্যমেই মুছে ফেলা তথ্য জানা যায়। যেমন মেসেজটি মুছে ফেলার আগেই যদি গ্রুপের বা ব্যক্তিগত চ্যাটের কেউ সেটিতে ‘Reply’ বা ‘Quote’ করে মেসেজ পাঠায়, তবে সেই উত্তর বা রিপ্লাইয়ের ওপরে মূল মেসেজের কিছু অংশ থেকে যায়।
এমনকি মূল পাঠানো ব্যক্তি মেসেজটি ডিলিট করে দিলেও কোট করা মেসেজের বক্সে সেটি থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই চ্যাট বক্সে ওপর-নিচে স্ক্রল করে আগের রিপ্লাইগুলো ভালো করে চেক করে দেখতে পারেন।
৫. থার্ড পার্টি অ্যাপ ব্যবহারের নিরাপত্তা ঝুঁকি
প্লে-স্টোরে বা ইন্টারনেটে বেশ কিছু থার্ড-পার্টি অ্যাপ পাওয়া যায়, যেগুলো দাবি করে যে তারা হোয়াটসঅ্যাপের ডিলিট হওয়া সব মেসেজ এবং ছবি এনে দিতে পারবে। অনেকেই কৌতূহলের বশে এই অ্যাপগুলো ব্যবহার করেন।
তবে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব থার্ড-পার্টি অ্যাপ ফোনে ইনস্টল করা একেবারেই নিরাপদ নয়। কারণ:
- এসব অ্যাপ আপনার ফোনের নোটিফিকেশন, গ্যালারি এবং স্টোরেজের সম্পূর্ণ পারমিশন বা অনুমতি চায়।
- আপনার ব্যক্তিগত মেসেজ, ওটিপি (OTP), ছবি ও ব্যাংকিং সংক্রান্ত তথ্য তাদের সার্ভারে চলে যেতে পারে।
- হোয়াটসঅ্যাপের নিজস্ব পলিসির কারণে এসব অননুমোদিত অ্যাপ ব্যবহার করলে আপনার আসল অ্যাকাউন্টটি সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ (Ban) হতে পারে।
তাই মেসেজ দেখার কৌতূহল মেটাতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নষ্ট করবেন না।
হোয়াটসঅ্যাপের ডিলিট হওয়া মেসেজ দেখার কৌতূহল আমাদের সবারই কম-বেশি থাকে। তবে কোনো অজানা বা থার্ড-পার্টি অ্যাপের ফাঁদে না পড়ে ফোনের নিজস্ব নোটিফিকেশন হিস্টোরি এবং নিয়মিত অফিশিয়াল ব্যাকআপ পদ্ধতি ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
এতে যেমন আপনার কৌতূহল মিটবে, তেমনই সুরক্ষিত থাকবে আপনার স্মার্টফোন ও ব্যক্তিগত সব গোপনীয় তথ্য। নিবন্ধটি দরকারী মনে হলে প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!








