ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা বাজতে শুরু করেছে। নির্বাচনের এই মহাযজ্ঞে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রার্থীরা শেষ মুহূর্তের দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত। ঠিক এমনই এক সময়ে বড় ধরনের বিপাকে পড়েছেন এনসিপি (NCP) থেকে সদ্য পদত্যাগকারী নেত্রী ও ঢাকা-৯ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আজই (সোমবার) শেষ দিন। কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত ‘১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন’ বা স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি হোঁচট খেয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের সার্ভার জটিলতা এবং তথ্য পাওয়ার পথগুলো বন্ধ থাকায় তার প্রার্থিতা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
১ শতাংশ স্বাক্ষরের শর্ত ও বর্তমান সংকট
বাংলাদেশের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, কোনো দল থেকে মনোনীত না হয়ে যদি কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়াতে চান, তবে তাকে বেশ কিছু কঠিন শর্ত পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং শর্তটি হলো সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটারের ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর সংগ্রহ করা।
শুধু স্বাক্ষর নিলেই হয় না, ওই ভোটারদের নাম ও ভোটার আইডি নম্বর বা সিরিয়াল নম্বরও নির্ভুলভাবে জমা দিতে হয়। তাসনিম জারা গতকাল রবিবার থেকে তার নির্বাচনী এলাকা খিলগাঁও থেকে এই স্বাক্ষর সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। কিন্তু ভোটারদের নাম ও স্বাক্ষর পাওয়া গেলেও তাদের ‘ভোটার সিরিয়াল নম্বর’ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি বড় বাধার সম্মুখীন হন।
তাসনিম জারার অভিযোগ: সব পথ বন্ধ
তাসনিম জারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, নির্বাচন কমিশন ভোটার নম্বর পাওয়ার বা যাচাই করার যে ৫টি ডিজিটাল মাধ্যম রেখেছিল, তার সবই বর্তমানে অকার্যকর।
তিনি বলেন, “ভোটার নম্বর পাওয়ার ৫টি উপায় আছে। এক হলো এসএমএস করে, অনলাইনে ওয়েবসাইট থেকে, কল সেন্টারে ফোন করে, অথবা কিউ আর কোড ব্যবহার করে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কোনো উপায়ই খোলা রাখেনি। প্রত্যেকটা পথ বন্ধ করে রাখা হয়েছে।”
সাধারণত ভোটাররা তাদের স্মার্ট কার্ড বা এনআইডি নম্বর জানলেও ভোটার তালিকায় তাদের সিরিয়াল নম্বর কত, তা জানেন না। এই নম্বরটি অনলাইনে বা এসএমএসের মাধ্যমে জেনে ফর্মে পূরণ করতে হয়। তাসনিম জারা অভিযোগ করেন, “ওয়েবসাইটের সার্ভার ডাউন। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হব, এ ক্ষেত্রে ভোটার নম্বর লাগবেই। কিন্তু একদম অসম্ভব করে রাখা হয়েছে বিষয়টি। মনে হচ্ছে ইচ্ছে করেই সব পথ বন্ধ রাখা হয়েছে।”
ডিজিটাল বিড়ম্বনা নাকি অব্যবস্থাপনা?
আজ সোমবার মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন বিকেল ৫টা পর্যন্ত। হাতে সময় অত্যন্ত কম। এই অল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার ভোটারের সিরিয়াল নম্বর ম্যানুয়ালি খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব।
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট এবং ১০৫ নম্বরে এসএমএস সেবাটি প্রার্থীদের সহায়তা করার কথা থাকলেও, ঠিক প্রয়োজনের মুহূর্তে তা কাজ না করায় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। তাসনিম জারা জানান, তিনি এবং তার কর্মীরা দিনরাত পরিশ্রম করেও ভোটার নম্বর উদ্ধার করতে হিমশিম খাচ্ছেন। যদি এই সমস্যার সমাধান না হয়, তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অসম্পূর্ণ থাকার কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যেতে পারে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার নিয়মাবলি
পাঠকদের জানার সুবিধার্থে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার নিয়মগুলো নিচে তুলে ধরা হলো। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে অবশ্যই:
- বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে।
- বয়স অন্তত ২৫ বছর পূর্ণ হতে হবে।
- ভোটার তালিকায় নাম থাকতে হবে।
- আয়কর রিটার্ন, সম্পদের বিবরণী এবং হলফনামা জমা দিতে হবে।
- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: নির্বাচনী এলাকার ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা জমা দিতে হবে।
তবে উল্লেখ্য, কেউ যদি আগে অন্তত একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন, তবে তার ক্ষেত্রে এই ১ শতাংশ স্বাক্ষরের নিয়মটি প্রযোজ্য নয়। তাসনিম জারা যেহেতু আগে সংসদ সদস্য ছিলেন না, তাই তাকে এই বাধ্যবাধকতা মানতেই হবে।
সময়ের সাথে পাল্লা ও শেষ মুহূর্তের উদ্বেগ
ঢাকা-৯ আসনটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে তাসনিম জারা ইতিমধ্যেই আলোচনায় এসেছেন। এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে তিনি নিজের মতো করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
কিন্তু মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনে এসে এমন প্রযুক্তিগত বাধার মুখে পড়া তার নির্বাচনী প্রচারণাকে শুরুতেই বড় ধাক্কা দিয়েছে। তার সমর্থকরা বলছেন, নির্বাচন কমিশন যদি সবার জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে চায়, তবে সার্ভার জটিলতা দ্রুত নিরসন করা উচিত ছিল।
এখন প্রশ্ন হলো, বিকেল ৫টার মধ্যে কি তিনি ভোটার নম্বর সংগ্রহ করে তালিকা পূর্ণ করতে পারবেন? নাকি প্রযুক্তিগত বিভ্রাটের কারণে একজন সম্ভাবনাময় প্রার্থীর নির্বাচন করার স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে? উত্তর মিলবে আজ বিকেলেই।








