রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন (ভারপ্রাপ্ত) তারেক রহমানের চলন্ত গাড়ি লক্ষ্য করে ঘটে গেছে এক অভাবনীয় ও রহস্যজনক ঘটনা। নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে চলন্ত অবস্থায় তার গাড়িতে স্কচটেপ দিয়ে একটি সাদা খাম সেঁটে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে পালিয়ে গেছেন এক মোটরসাইকেল চালক। গত বুধবার রাতে গুলশানের অত্যন্ত সুরক্ষিত এলাকায় এই ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত সেই বাইকারকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। খামের ভেতর কী ছিল, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। ভিআইপি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এমন ফাটল ধরায় রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
গুলশানের রাস্তায় নাটকীয় ঘটনা: ঠিক কী ঘটেছিল?
গত বুধবার রাত তখন প্রায় পৌনে ১২টা। গুলশানের ৬৫ নম্বর সড়ক দিয়ে নিজের কার্যালয় থেকে বাসবভনের দিকে ফিরছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান। তাঁর ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত বুলেটপ্রুফ গাড়িটি একটি সুশৃঙ্খল বহরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। এই বহরে যুক্ত ছিল তাঁর নিজস্ব নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনী বা সিএসএফ (CSF)-এর সদস্যরাও।
হঠাৎ করেই একটি সাদা রঙের হিরো হাংক (Hero Hunk) মোটরসাইকেল তীব্র গতিতে গাড়িবহরের কাছাকাছি চলে আসে। চালক অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে তারেক রহমানের গাড়ির জানালার কাচের অংশে স্কচটেপ দিয়ে একটি সাদা খাম লাগিয়ে দেন। এরপর চোখের পলকে আমেরিকান ক্লাবের দিকে মোড় নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যান। পুরো ঘটনাটি ঘটে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে, যা উপস্থিত নিরাপত্তা কর্মীদেরও হতভম্ব করে দেয়।
সিসিটিভি ফুটেজ ও পুলিশের ভাষ্য
ঘটনার পরপরই গুলশান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। গুলশান থানার পুলিশ আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। এ বিষয়ে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, ফুটেজে ঘটনাটি দেখা গেলেও তা খুব একটা স্পষ্ট নয়।
ওসি বলেন, “ভিডিওতে দেখা যায়, মোটরসাইকেলটি তীব্র গতিতে এসে বিএনপি চেয়ারপারসনের বুলেটপ্রুফ গাড়িতে একটি খাম স্কচটেপ দিয়ে লাগিয়ে টান দিয়ে চলে যায়। বাইকে চালক একাই ছিলেন। তিনি ৬৫ নম্বর সড়ক দিয়ে আমেরিকান ক্লাবের দিকে দ্রুত পালিয়ে যান। তবে চালকের মাথায় হেলমেট থাকায় এবং গাড়ির নম্বর প্লেট স্পষ্ট না হওয়ায় তাকে এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।”
পুলিশ আরও জানায়, চার দিন পেরিয়ে গেলেও ওই মোটরসাইকেল বা চালকের কোনো হদিস মেলেনি। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েও তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত বাইকারের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি, যা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠছে।
রহস্যময় খাম: ভেতরে কী ছিল?
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় রহস্য হলো ওই সাদা খামটি। চলন্ত গাড়িতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একজন বাইকার কেন শুধু একটি খাম লাগাতে আসবেন? খামের ভেতর কি কোনো গোপন বার্তা, হুমকি, নাকি কোনো বিশেষ অনুরোধ ছিল?
গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) রওনক আলম জানান, খামের বিষয়বস্তু সম্পর্কে পুলিশ এখনো অন্ধকারে রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা ঘটনাটি তদন্ত করছি। তবে ওই খামে কী লেখা ছিল বা ভেতরে কী আছে, তা আমাদের জানানো হয়নি। খামটি বর্তমানে সিএসএফ বা তারেক রহমানের নিজস্ব নিরাপত্তা দলের কাছে সংরক্ষিত আছে।”
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, খামের বিষয়বস্তু যা-ই হোক না কেন, ঘটনার ধরনটি অত্যন্ত উদ্বেগের। আজ একটি খাম লাগানো হয়েছে, কিন্তু দুর্বৃত্তরা চাইলে বড় কোনো অঘটনও ঘটাতে পারত।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড়সড় ফাটল?
তারেক রহমান দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর চলাচলের সময় সাধারণত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী (CSF) এবং দলীয় নেতাকর্মীদের ভিড় ঠেলে একজন অচেনা বাইকার কীভাবে বুলেটপ্রুফ গাড়ির একদম কাছে পৌঁছে গেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সাধারণত ভিআইপি মুভমেন্টের সময় আশপাশের যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সেখানে একটি মোটরসাইকেল কীভাবে নিরাপত্তা বলয় ভেদ করল, তা তদন্তের দাবি রাখে। এটি কি নিছকই কোনো ভক্তের কাজ, নাকি এর পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
জনমনে আতঙ্ক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, গুলশানের মতো হাই-সিকিউরিটি জোন বা কূটনৈতিক এলাকায় এমন ঘটনা কীভাবে ঘটে? বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তাদের নেতার নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, “ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটেছে যে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাইকার হাওয়া হয়ে যায়। তবে বাইক চালকের দক্ষতা দেখে মনে হয়েছে তিনি কোনো সাধারণ চালক নন, বরং বেশ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।”
তদন্তের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
পুলিশ জানিয়েছে, তারা সব দিক বিবেচনা করেই তদন্ত চালাচ্ছে। রাস্তার অন্যান্য সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বাইকটির গতিপথ এবং গন্তব্য বের করার জন্য। গুলশান থানা পুলিশ আশাবাদী, খুব শীঘ্রই তারা ওই রহস্যময় বাইকারকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হবে।
তবে যতদিন না খামের রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে এবং বাইকার ধরা পড়ছে, ততদিন এই ঘটনা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা থামছে না। তারেক রহমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনা যেন ভবিষ্যতে আর না ঘটে, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








