দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। সাধারণ মানুষের সরাসরি ভোটে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর প্রথমবারের মতো সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাজধানীর শাহবাগে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে তিনি কেবল জয়ের আনন্দ প্রকাশ করেননি, বরং আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তুলে ধরেছেন।
বিজয় উৎসর্গ করা হয়েছে জনগণকে
তারেক রহমান তার বক্তব্যের শুরুতেই এই বিজয়কে গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণের বিজয় হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “এ বিজয় বাংলাদেশের, এ বিজয় সেসব জনগণের যারা গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষায় রাজপথ ছাড়েননি এবং অকাতরে আত্মত্যাগ করেছেন।” আলহামদুলিল্লাহ বলে সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করে তিনি এই জয়কে গণতন্ত্রের জন্য যারা শহীদ হয়েছেন এবং যারা নির্যাতিত হয়েছেন, তাদের নামে উৎসর্গ করেন।
রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা ও জুলাই সনদ
বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হবে দলটির দীর্ঘদিনের গবেষণালব্ধ ৩১ দফা এবং বিতর্কিত বিষয়গুলোর সমন্বয়ে তৈরি হওয়া জুলাই সনদ। তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন যে:
- ৩১ দফার বাস্তবায়ন: বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি হয়েছে এই ৩১ দফাকে কেন্দ্র করেই। প্রতিটি অঙ্গীকার ধাপে ধাপে পূরণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
- জুলাই সনদ: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চেতনা এবং জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তাকে সম্মান জানিয়ে বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে।
- নোট অব ডিসেন্ট: কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে দ্বিমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকলেও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে বিএনপি এই সনদের সংস্কারমূলক কাজের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে।
শান্তিশৃঙ্খলা ও প্রতিহিংসা পরিহারের নির্দেশ
বিজয়োত্তর বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় শঙ্কা থাকে সহিংসতা এবং প্রতিহিংসার। তবে তারেক রহমান এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। তিনি বলেন:
- বিজয় মিছিল বন্ধ: কোনো অপশক্তি যাতে পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে, তাই তিনি বিজয় মিছিল বের করতে নিষেধ করেছেন।
- আইনের শাসন: দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
- দুর্বলের ওপর আঘাত নয়: তিনি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন যে, কোনো অজুহাতে দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ বরদাস্ত করা হবে না।
“আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে আমাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। আইনের শাসন প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান।” তারেক রহমান
অর্থনীতি ও বৈদেশিক নীতি: বাংলাদেশের স্বার্থই সবার আগে
সংবাদ সম্মেলনে একজন বিদেশি সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন।
১. ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন
দেড় দশকেরও বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটলেও দেশের অর্থনীতি বর্তমানে চরম সংকটে। তারল্য সংকট, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম এবং পুঁজি সংকট কাটাতে বিএনপি সরকার বিশেষ সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
২. পররাষ্ট্রনীতি: ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তারেক রহমানের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট নিজের দেশের স্বার্থ আগে দেখা হবে। তিনি জানান, ভারত, চীন বা অন্য যেকোনো দেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে তবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
৩. সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সার্ক (SAARC)-কে আবার সক্রিয় করতে চায় বিএনপি। তারেক রহমান মনে করেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে এই জোটের গুরুত্ব অপরিসীম।
শেখ হাসিনার বিচার ও আইনের শাসন
ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তার বিচার প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, এটি সম্পূর্ণভাবে আদালতের এখতিয়ার। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) এর রায় অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়ায় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সরকার এখানে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না, বরং অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে আইনগত প্রক্রিয়া বজায় রাখবে।
বিএনপির ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ নিয়ে মজার জবাব
নির্বাচনে দুই শতাধিক আসন লাভের পেছনে কোনো ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ ছিল কি না এমন এক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলেন, “জনগণকে কনভিন্স করাটাই ছিল আমাদের একমাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আমরা সেখানে সফল হয়েছি।”
একটি মানবিক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ
তারেক রহমানের এই সংবাদ সম্মেলন ছিল মূলত আশার কথা শোনানোর জন্য। তিনি সকল রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী থেকে শুরু করে গণঅধিকার পরিষদ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেওয়া সকল দলকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, মতভেদ থাকলেও দেশের স্বার্থে আমাদের এক থাকতে হবে।
এখন দেখার বিষয়, তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই নতুন সরকার ভঙ্গুর অর্থনীতি সংস্কার করে একটি জবাবদিহিমূলক সংসদ উপহার দিতে পারে কি না। জনগণের প্রত্যাশা পাহাড় সমান, আর এই প্রত্যাশা পূরণ করাই হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।








