বাংলাদেশের সংগীত জগতের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পী, অভিনেতা ও উপস্থাপক তাহসান খান। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি গান, নাটক আর উপস্থাপনার মাধ্যমে ভক্তদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। তবে এবার ভক্তদের জন্য এল দুঃখের সংবাদ, তাহসান খানের আবেগঘন বিদায়, অভিনয়ের মতোই এবার গান থেকেও ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছেন প্রিয় এই শিল্পী।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে আয়োজিত এক কনসার্টে ভক্তদের উদ্দেশে আবেগঘন বক্তব্যে তাহসান জানান, সংগীত ক্যারিয়ার গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তার কণ্ঠে ঝরে পড়ে কৃতজ্ঞতা, আবেগ এবং এক ধরনের শান্তি, যেন দীর্ঘ একটি যাত্রার পর অবশেষে বিরতি টানার ঘোষণা।
মেলবোর্ন কনসার্টে আবেগঘন মুহূর্ত
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের এক সন্ধ্যায়, মেলবোর্ন শহরের একটি স্টেজে দাঁড়িয়ে তাহসান বললেন-
“এটাই আমার লাস্ট কনসার্ট। আস্তে আস্তে মিউজিক ক্যারিয়ারটাও গুটিয়ে ফেলব। মেয়ে বড় হচ্ছে, এখন দাঁড়ি রেখে স্টেজে দাঁড়িয়ে এমন লাফালাফি করতে ভালো লাগে না।”
তার এই কথায় মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যান উপস্থিত দর্শকরা। যারা ব্ল্যাক ব্যান্ডের সময় থেকে তাহসানের গান শুনে আসছেন, তাদের জন্য এ যেন হৃদয় ভাঙার মুহূর্ত। ভক্তদের অনেকেই চোখের জল আটকাতে পারেননি।
ঢাকায় হবে শেষ কনসার্ট
কনসার্ট শেষে এক সাক্ষাৎকারে তাহসান বলেন-
“অস্ট্রেলিয়ায় নয়, আমার শেষ কনসার্ট হবে ঢাকায়। দেশে ফিরে একটি কনসার্টে অংশ নেব। আশা করছি সেটিই হবে আমার বিদায়ী মঞ্চ।”
অর্থাৎ, বাংলাদেশের ভক্তদের জন্য তিনি শেষবারের মতো মঞ্চে উঠবেন। তাই ঢাকার কনসার্টটি হবে বিশেষ আবেগঘন এবং ভক্তদের জন্য এক অনন্য স্মৃতি।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে
ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ভক্তরা খেয়াল করেছেন, তাহসান তার সব সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভ করেছেন। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না তার অফিশিয়াল প্রোফাইল।

এ বিষয়টি প্রমাণ করে, তিনি সত্যিই আলো ঝলমলে শোবিজ দুনিয়া থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছেন।
শারীরিক অসুস্থতার দীর্ঘদিনের লড়াই
তাহসানের গানের ভক্তরা জানেন, তিনি বেশ কিছু বছর ধরে কণ্ঠনালির সমস্যায় ভুগছেন। তার কণ্ঠে ধরা পড়ে হেটেরোটোপিয়া নামের একটি রোগ।
এই অসুস্থতায় গলার কাঠামো বদলে যায়, ফলে গান গাওয়ার ক্ষমতা কমে আসে। ২০১৮ সাল থেকেই তিনি এই সমস্যায় ভুগছেন। সে সময় ভক্তদের উদ্দেশে বলেছিলেন-
“যদি দেখেন আমি কনসার্ট বা লাইভে গান গাওয়া কমিয়ে দিয়েছি, বুঝবেন সমস্যাটা বেড়েছে। আমার জন্য দোয়া করবেন যেন আর না বাড়ে।”
এই সমস্যার কারণে নিয়মিত গানে থাকতে তার কষ্ট হচ্ছিল। যদিও তিনি কখনও সরাসরি এটিকে অবসরের কারণ বলেননি, তবে অনেকেই মনে করেন – এই অসুস্থতাই তাকে গান থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য করেছে।
অভিনয় ছাড়ার ঘোষণা
এর আগে ২০২৪ সালে তাহসান ঘোষণা দেন, অভিনয় থেকে তিনি সরে যাচ্ছেন। তিনি বলেছিলেন-
“আমি ২০ বছর ধরে অভিনয়ে কাজ করছি। কখনো কখনো নিজেকেই নিজের বিরতি নিতে হয়। কাজ একঘেয়ে হয়ে গেলে বা ভালো কাজ না হলে তখন থেমে যাওয়া জরুরি।”
অর্থাৎ, অভিনয়ের পর এবার গানের মঞ্চ থেকেও বিদায় নিচ্ছেন তিনি।
পরিবারকে সময় দেওয়ার তাগিদ
তাহসান স্পষ্ট জানিয়েছেন, জীবনের এই পর্যায়ে এসে তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবার ও মেয়ে।
তার ভাষায়-
“আমি মনে করি, যা দেওয়ার ছিল তা দিয়ে ফেলেছি। পেয়েছি প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি। এখন সাধারণ জীবনে ফিরে যেতে চাই। মেয়ে বড় হচ্ছে, ওর পাশে থাকার সময় এসেছে।”
তাহসানের সংগীত ভ্রমণ
- শুরু: ব্যান্ড ব্ল্যাক–এর মাধ্যমে সংগীতে যাত্রা
- সোলো অ্যালবাম: ‘কথোপকথন’ (২০০৪), যা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়
- জনপ্রিয় গান:
- আলো
- কে তুমি
- ঈর্ষা
- আমি সেই সুতো
- ব্যান্ড গঠন: তাহসান অ্যান্ড দ্য সুফিজ, পরবর্তীতে Tahsan & The Band
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য গান শ্রোতাদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে আছে।
তাহসান: এক প্রজন্মের অনুপ্রেরণা
তাহসান খান শুধু একজন গায়ক নন, তিনি এক প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। তার গান, অভিনয় আর ব্যক্তিত্ব লাখো তরুণ-তরুণীর হৃদয়ে ছাপ ফেলেছে।
বাংলাদেশি পপ, ব্যান্ড ও আধুনিক গানে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি তারুণ্যের আবেগ, প্রেম, বিচ্ছেদ ও জীবনের বাস্তবতাকে গান ও অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।
দীর্ঘ ২৫ বছরের সংগীত ভ্রমণ শেষে তাহসান খান এবার ধীরে ধীরে গানের মঞ্চ থেকেও সরে যাচ্ছেন। অভিনয়, গান ও উপস্থাপনা – সব ক্ষেত্রেই তিনি তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।
ভক্তরা হয়তো চান তিনি আবার ফিরে আসুন, কিন্তু তাহসান এখন পরিবারকেই অগ্রাধিকার দিতে চান। তার বিদায়ী কনসার্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলে সেটিই হবে ভক্তদের জন্য শেষ সুযোগ, যেখানে তারা প্রিয় শিল্পীকে গান গাইতে দেখবেন।
তাহসান চলে যাচ্ছেন, কিন্তু তার গান চিরকাল থেকে যাবে ভক্তদের হৃদয়ে।








