রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা কারওয়ান বাজারে এক লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়েছেন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বির। বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ৮টার দিকে কারওয়ান বাজারের স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে, পশ্চিম তেজতুরি বাজার এলাকায় এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে।
এই ঘটনায় আরও একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তিনি হলেন কারওয়ান বাজার ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান মাসুদ। প্রকাশ্যে এমন হত্যাকাণ্ডে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সিসিটিভি ফুটেজে কিলিং মিশনের দৃশ্য
হত্যাকাণ্ডের পরপরই ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। ফুটেজে যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা রীতিমতো গা শিউরে ওঠার মতো। ভিডিওতে দেখা যায়, তেজতুরি বাজারের ওই অন্ধকার গলিতে আগে থেকেই ওত পেতে ছিল দুই দুর্বৃত্ত। তাদের কাছে ছিল চটের বস্তা, যা দেখে মনে হতে পারে তারা সাধারণ কুলি বা শ্রমিক।
স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুসাব্বির রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ওই দুই দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে। মুসাব্বিরকে দেখামাত্রই তারা বস্তার ভেতর থেকে পিস্তল বের করে। এরপর পেছন থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। আচমকা গুলিতে মুসাব্বির মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টায় তিনি মাটি থেকে উঠে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় তার মোবাইল ফোনটি হাত থেকে পড়ে যায়। হামলাকারীরা মুসাব্বিরকে মৃত্যু নিশ্চিত করে তার পড়ে থাকা ফোনটি নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য ও পদক্ষেপ
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, “রাতে কারওয়ান বাজারের স্টার কাবাবের পেছনের গলি দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন মুসাব্বির। তার সঙ্গে আবু সুফিয়ান মাসুদসহ আরও কয়েকজন ছিলেন। দুর্বৃত্তরা আগে থেকেই অন্ধকারে লুকিয়ে ছিল। মুসাব্বিরকে রেঞ্জ বা সীমানার মধ্যে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা পেছন থেকে গুলি করে।”
তিনি আরও জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর স্থানীয়রা এবং সহকর্মীরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে পান্থপথের বিআরবি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, আহত আবু সুফিয়ান মাসুদকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) পাঠানো হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত ইতিহাস
নিহত আজিজুর রহমান মুসাব্বির বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের একজন প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম-সম্পাদক পদেও ছিলেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণে তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেছেন। স্বৈরাচারী শাসনের শেষ সময়ে তিনি একটানা ১৮ মাস জেলে ছিলেন। জেল থেকে বের হয়ে তিনি আবার দলের কার্যক্রমে সক্রিয় হচ্ছিলেন। তার এই হঠাৎ মৃত্যুতে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
হাসপাতালে নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ
মুসাব্বিরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিআরবি হাসপাতালের সামনে জড়ো হতে থাকেন স্বেচ্ছাসেবক দলের শত শত নেতাকর্মী। তারা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
পরে নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ দেখে খুনিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। সেনাবাহিনীর টহল দল এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
কারা এবং কেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নাকি ব্যক্তিগত শত্রুতা, তা তদন্তের পর জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।








