আন্তর্জাতিক বাজারে টানা তিন সপ্তাহ উর্ধ্বগতির পর অবশেষে স্বস্তির খবর এলো স্বর্ণের দামে। মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে মূল্যবান এই ধাতুটির দামে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। মূলত বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গত কয়েক দিন ধরে যারা স্বর্ণের দাম বাড়া নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, তাদের জন্য বাজারের এই বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলুন দেখে নেওয়া যাক কেন এই হঠাৎ পতন এবং সামনের দিনগুলোতে বাজার কোন দিকে যেতে পারে।
কেন কমলো স্বর্ণের দাম
স্বর্ণের দাম কমার পেছনে বেশ কিছু অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক কারণ কাজ করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গত সেশনে স্বর্ণের দাম ২ শতাংশের বেশি বাড়ার পর বিনিয়োগকারীরা তাদের লাভ তুলে নিতে শুরু করেছেন। যখনই বাজারে বড় ধরনের মুনাফা তৈরির সুযোগ থাকে, তখনই বড় বিনিয়োগকারীরা সম্পদ বিক্রি করে টাকা হাতে নিতে চান, যাকে বলা হয় ‘প্রফিট টেকিং’।
ডলারের শক্তিশালী অবস্থান
স্বর্ণের দাম কমার অন্যতম প্রধান কারণ হলো মার্কিন ডলারের মান বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণ সাধারণত ডলারে কেনাবেচা হয়। ফলে ডলার যখন শক্তিশালী হয়, অন্যান্য মুদ্রার বিনিময়ে স্বর্ণ কেনা তখন ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। এতে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে চাহিদা কমে যায় এবং দামের ওপর চাপ তৈরি হয়।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও বৈশ্বিক উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি নিয়ে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, সম্প্রতি করা বাণিজ্য চুক্তি থেকে কোনো দেশ সরে গেলে তাদের ওপর আরও কঠোর শুল্ক আরোপ করা হবে। যদিও মার্কিন সুপ্রিমকোর্ট তার কিছু সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে, তবুও বাজারে এর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের বর্তমান অবস্থা
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ সময় বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে স্পট গোল্ডের দাম আউন্সপ্রতি ১.২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫,১৬৭.২৮ ডলারে। এর মাধ্যমে টানা চার দিন ধরে চলা দাম বাড়ার প্রবণতা থেমে গেল।
অন্যদিকে, ফিউচার মার্কেটেও এর প্রভাব পড়েছে। এপ্রিল মাসে ডেলিভারির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণের ফিউচার ০.৭ শতাংশ কমে ৫,১৮৭.৪০ ডলারে নেমে এসেছে। বাজার বিশ্লেষক সংস্থা ‘টেস্টিলাইভ’-এর মতে, আগের দিন স্বর্ণের দামে যে বড় লাফ দেখা গিয়েছিল, বর্তমান পতনটি মূলত তার একটি ‘সমন্বয়’ বা অ্যাডজাস্টমেন্ট।
ফেডারেল রিজার্ভের সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ আভাস
স্বর্ণের বাজারের পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’-এর সিদ্ধান্তের ওপর। ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর ক্রিস্টোফার ওয়ালার জানিয়েছেন, যদি আগামী মাসের কর্মসংস্থান রিপোর্ট ভালো থাকে, তবে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে।
সাধারণত সুদের হার কমানো হলে স্বর্ণের দাম বাড়ে। বিনিয়োগকারীরা এখন মার্চের বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছেন। সিএমই ফেডওয়াচ টুলের তথ্যমতে, এ বছর বিনিয়োগকারীরা অন্তত তিনবার সুদের হার কমার সম্ভাবনা দেখছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের দামকে আবার চাঙ্গা করতে পারে।
অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজার পরিস্থিতি
শুধুমাত্র স্বর্ণ নয়, অন্যান্য ধাতুর দামেও অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে:
- রুপা: স্পট সিলভারের দাম ০.৯ শতাংশ কমে আউন্সপ্রতি ৮৭.৩৯ ডলারে নেমেছে।
- প্লাটিনাম: এর দাম ০.৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২,১৪২.৩৫ ডলারে।
- প্যালাডিয়াম: তবে ব্যতিক্রম হিসেবে প্যালাডিয়ামের দাম ০.৪ শতাংশ বেড়ে ১,৭৫০.৯৮ ডলারে উঠেছে।
সাধারণ ক্রেতাদের জন্য পরামর্শ
স্বর্ণের বাজারে এখন এক ধরনের অস্থিরতা চলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও স্থানীয় বাজারে এর প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লাগে। তাই যারা অলঙ্কার তৈরির জন্য স্বর্ণ কিনতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য বর্তমান বাজার পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। হুট করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে আগামী কয়েক দিনের বাজার পরিস্থিতি দেখে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।








