বাংলাদেশে পরিবহণ খাত মানেই এক বিশাল সিন্ডিকেট। বাস, ট্রাক, সিএনজি অটোরিকশা থেকে শুরু করে ব্যাটারিচালিত রিকশা, রাস্তায় চাকা ঘুরলেই দিতে হয় চাঁদা। সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সারা দেশে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি টাকা অবৈধভাবে আদায় করা হচ্ছে পরিবহণ খাত থেকে। এই বিশাল অঙ্কের টাকা শেষ পর্যন্ত কার পকেটে যাচ্ছে এবং কেন এটি বন্ধ হচ্ছে না, তা নিয়ে আজকের বিশেষ প্রতিবেদন।
চাঁদা বনাম চাঁদাবাজি: মন্ত্রীর বক্তব্যে বিতর্ক
সম্প্রতি সড়ক পরিবহণ, সেতু, রেল ও নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের একটি বক্তব্য দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে। তিনি বলেছেন, ‘একটা হলো চাঁদা, আর একটা হলো চাঁদাবাজি। চাঁদা হলো স্বেচ্ছায় আর চাঁদাবাজি হলো জোরপূর্বক।’ মন্ত্রীর মতে, মালিক ও শ্রমিক সমিতিগুলো নিজেদের কল্যাণের জন্য যে টাকা তোলে, তাকে তিনি সরাসরি চাঁদাবাজি বলতে রাজি নন। তবে সাধারণ চালক ও মালিকদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই টাকা ভয়ভীতি দেখিয়ে বা বাধ্য করে আদায় করা হয়।
প্রতিদিন ১০০ কোটি টাকা আদায়ের চালচিত্র
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় ৩ হাজার স্পট থেকে এই চাঁদা তোলা হয়। আসুন দেখে নিই কোন খাত থেকে কত টাকা আদায় হচ্ছে:
| যানবাহনের ধরন | সংখ্যা (প্রায়) | দৈনিক গড় চাঁদা | মোট দৈনিক আদায় |
| সিটি বাস | ৮,০০০ | ৮০০ টাকা | ৬৪ লাখ টাকা |
| দূরপাল্লার বাস | ৬০,০০০+ | ৫০০ টাকা | ৩ কোটি টাকা |
| ঢাকার সিএনজি | ১৮,০০০ | ১৫০ টাকা | ২৭ লাখ টাকা |
| ব্যাটারিচালিত রিকশা | ৬০ লাখ | ৮০-১৫০ টাকা | ৫৫ কোটি টাকা |
| পণ্যবাহী ট্রাক | ৪,০০,০০০ | ১,০০০ টাকা | ৪০ কোটি টাকা |
মোট আনুমানিক আদায়: প্রায় ১০০ কোটি টাকা প্রতিদিন।
সিন্ডিকেটের জালে কারা?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই চাঁদাবাজির টাকা কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে থাকে না। এটি একটি চেইন বা ভাগাভাগির মাধ্যমে বিভিন্ন স্তরে পৌঁছায়।
- মালিক ও শ্রমিক সমিতি: টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা ও কল্যাণের নামে বড় অংশ তারা নেয়।
- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী: পুলিশ ও ট্রাফিক সদস্যদের একাংশ রাস্তার মোড়ে মোড়ে টোকেন বা জিপির নামে টাকা নেয়।
- রাজনৈতিক প্রভাবশালী: ক্ষমতা বদল হলেও চাঁদাবাজির লাঠি বদলায় না। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা লাইনম্যান নিয়োগ করে এই টাকা নিয়ন্ত্রণ করেন।
দেশের প্রধান শহরগুলোর চিত্র
দেশের বড় শহরগুলোতে চাঁদাবাজির ধরণ ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য একই।
চট্টগ্রাম: ১৬ বছরে ১৪০০ কোটি টাকা
চট্টগ্রামে বিগত ১৬ বছরে পরিবহণ খাত থেকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। বাসে ১৫০ টাকা এবং হিউম্যান হলারে ২০০ টাকা হারে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা তোলা হচ্ছে।
সিলেট ও রাজশাহী: রশিদের রঙ বদলায়, কিন্তু চাঁদা নয়
সিলেটে ‘শ্রমিক কল্যাণ তহবিল’ বা ‘লাইনম্যান খরচ’ নামে ৫টি পয়েন্টে প্রকাশ্যে টাকা তোলা হয়। অন্যদিকে রাজশাহীতে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নামে বাস প্রতি ৬২০ টাকা আদায় করা হলেও তহবিলে জমা হয় সামান্য অংশ।
খুলনা ও বরিশাল: দখলের লড়াই
বরিশালে ৫ই আগস্টের পর ক্ষমতার হাতবদল হলেও চাঁদাবাজি থামেনি। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ যখন যারা ক্ষমতায় থাকে, টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই চলে যায়।
চাঁদাবাজির প্রভাবে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ
পরিবহণ খাতের এই চাঁদাবাজি শুধু চালকদের সমস্যা নয়, এটি সরাসরি আপনার পকেটে প্রভাব ফেলে।
- ভাড়া বৃদ্ধি: মালিকরা চাঁদার টাকা উসুল করতে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেন।
- পণ্যের দাম বৃদ্ধি: একটি সবজি ভর্তি ট্রাক যখন ঢাকা আসে, তাকে পথে পথে কয়েক হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। ফলে বাজারে সবজির দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়।
- নিরাপত্তাহীনতা: চাঁদার টাকায় প্রভাবশালীরা শক্তিশালী হয়, ফলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর আইন বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সমাধানের পথ কী?
যাত্রীকল্যাণ সমিতির মতে, কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নিলে এই অরাজকতা কমানো সম্ভব:
- ডিজিটাল ভাড়া পদ্ধতি: বাসে ডিজিটাল পেমেন্ট চালু করলে মাঝপথে টাকা আদায়ের সুযোগ থাকবে না।
- ক্যামেরা ট্রায়াল: ক্যামেরা দেখে মামলার পদ্ধতি চালু করলে পুলিশের সাথে সরাসরি আর্থিক লেনদেন কমবে।
- নিরপেক্ষ তদন্ত: একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করে চাঁদাবাজির উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে।
পরিবহণ খাতের এই ‘ওপেন সিক্রেট’ চাঁদাবাজি বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। সরকার বদলায়, মন্ত্রী বদলায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের ঘাম ঝরানো পয়সা লুটের এই উৎসব থামে না। যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও অসহনীয় হয়ে পড়বে।








