কথায় আছে ‘সকাল দেখলে বোঝা যায় দিনটা কেমন যাবে।’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ ২৬ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ তার শাসনের প্রথম সাতটি কর্মদিবস পূর্ণ হলো। এই অল্প সময়ে তিনি এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। কিন্তু এই চমক কি বজায় থাকবে? দেশবাসী আর কী কী পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছে? চলুন বিস্তারিত আলোচনা করি।
ক্ষমতার প্রথম সাত দিন: চমকের পর চমক
শপথ নেওয়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেকে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। তার নেওয়া প্রাথমিক সিদ্ধান্তগুলো সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো জাগিয়েছে।
ভিআইপি সংস্কৃতির অবসান
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি প্রথমেই রাজকীয় প্রটোকল ও বিলাসিতা বর্জনের ঘোষণা দেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন:
- তিনি কোনো রাষ্ট্রীয় বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করবেন না, বরং নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি ও নিজস্ব জ্বালানিতে চলবেন।
- তার চলাচলের সময় সড়কের দুই পাশে পুলিশ দাঁড়িয়ে থেকে জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটাবে না।
- ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে সাধারণ মানুষের মতোই যাতায়াত করবেন তিনি।
- প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর থেকে অতিরিক্ত গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে মাত্র ৪টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে।
প্রশাসনিক গতিশীলতা ও নিয়মানুবর্তিতা
প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রতিদিন ঘড়ি ধরে সকাল ৯টায় অফিসে আসছেন। শুধু তাই নয়, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সচিবরা সময়মতো অফিসে আসছেন কি না, তা তিনি নিজেই তদারকি করছেন। এমনকি প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়াতে তিনি শনিবারও অফিস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মানবিক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ
সম্প্রতি একটি অভাবনীয় ঘটনা দেশবাসীকে মুগ্ধ করেছে। ১৯ বছর আগে তার পরিচিত নূর নামের এক সাধারণ কর্মচারীকে নাম ধরে ডেকে তার কুশলাদি নিয়েছেন তিনি। এছাড়া অপহৃত এক স্কুলছাত্রকে তার বিশেষ হস্তক্ষেপে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
এমপিদের জন্য শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা বাতিল
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই সংসদীয় দলের বৈঠকে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তার দলের কোনো সংসদ সদস্য (এমপি) সরকারি প্লট বা শুল্কমুক্ত গাড়ি গ্রহণ করবেন না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত, যা দুর্নীতির লাগাম টানতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ: জনগণের আসল প্রত্যাশা
মানুষ এখন প্রধানমন্ত্রীকে ‘জনতার রাষ্ট্রনায়ক’ হিসেবে দেখছেন। তবে এই প্রশংসা ধরে রাখা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, শুধু প্রটোকল কমিয়ে জনতুষ্টি অর্জন করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের কিছু মৌলিক সমস্যার সমাধান না করলে সাধারণ মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।
১. চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধ করা
বিগত সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে ‘মব’ বা গণপিটুনি এবং নতুন মোড়কে চাঁদাবাজির যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল, তা বন্ধ করাই হবে তারেক রহমানের বড় পরীক্ষা। সাধারণ মানুষ চায় ‘চাঁদাবাজ’ ও ‘দখলবাজ’ শব্দগুলো যেন বাংলাদেশের অভিধান থেকে চিরতরে মুছে যায়। অপরাধীর একমাত্র পরিচয় হবে সে একজন অপরাধী, তার পেছনে কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় যেন ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।
২. বাজার সিন্ডিকেট ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ
সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা এখন বাজার। সিন্ডিকেটের কারণে নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। বিগত সরকারের আমলে মন্ত্রীদের মুখে ‘সিন্ডিকেটে হাত দেওয়া যাবে না’ এমন কথা শোনা গেছে। তারেক রহমান কি পারবেন এই শক্তিশালী বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দ্রব্যমূল্য মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে? এটি করতে পারলে দেশবাসী তাকে আজীবন মনে রাখবে।
৩. ব্যাংক খাত ও লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার
বিগত দেড় দশকে দেশের ব্যাংকিং খাতকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। ব্যাংক লুটেরা মাফিয়াদের বিচার করা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা তার সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
৪. রাষ্ট্রীয় কমিশনগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা
নির্বাচন কমিশন, দুদক, এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে (পিএসসি) সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা প্রয়োজন। যদি দুদক কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও তদন্ত করার সাহস পায়, তবেই বোঝা যাবে তারেক রহমানের শাসনকাল সফল হচ্ছে।
৫. সাংবাদিকতা ও পেশাজীবীদের মুক্তি
বাংলাদেশের সাংবাদিকরা দীর্ঘকাল ধরে দলীয় লেজুড়বৃত্তির কারণে বিভক্ত। প্রধানমন্ত্রী চাইলে একটি রাজনীতিমুক্ত ও ঐক্যবদ্ধ পেশাদার সাংবাদিক ইউনিয়ন গঠনে সহায়তা করতে পারেন। এছাড়া শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাজীবীদের মধ্য থেকে দলাদলি বন্ধ করে মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করাই হবে আধুনিক বাংলাদেশের আসল রূপ।
স্বপ্নের চেয়ে বড় হওয়ার সময়
জুলাই বিপ্লবের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর দেশবাসী অনেক আশা নিয়ে একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে। শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করার দায়িত্ব এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাঁধে। সাত দিনের চমক নিশ্চয়ই ইতিবাচক, তবে আসল কাজ হলো ঘুনে ধরা রাষ্ট্রযন্ত্রকে সংস্কার করা।
প্রধানমন্ত্রী যদি তার এই অদম্য ইচ্ছাশক্তি বজায় রাখেন এবং দলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে কঠোর হন, তবে বাংলাদেশ সত্যিই এক নতুন দিগন্তের দেখা পাবে। দেশবাসী এখন সেই আগামীর চমকের অপেক্ষায়।








