দক্ষিণ এশিয়ার দুই মুসলিম প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তান এখন রক্তক্ষয়ী এক সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ছাপিয়ে দুই দেশের সামরিক বাহিনী এখন একে অপরের ওপর ভারী অস্ত্র, ড্রোন এবং বিমান হামলা চালাচ্ছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘গজব লিল হক’ বা ‘ন্যায়ের ক্রোধ’। এই সংঘর্ষে ইতিমধ্যে দুই দেশেই কয়েকশ নিহতের খবর পাওয়া গেছে, যা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
যুদ্ধের সূত্রপাত যেভাবে: টিটিপি বনাম নিরাপত্তা ইস্যু
পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান তালেবান সরকার তাদের দেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত সশস্ত্র গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-কে আশ্রয় ও মদদ দিচ্ছে। টিটিপি আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানে বড় ধরনের হামলা চালাচ্ছে বলে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে ইসলামাবাদ। তবে কাবুল বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এই অবিশ্বাসের জের ধরেই শুক্রবার ভোরে পাকিস্তান বিমান বাহিনী আফগানিস্তানের কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিকায় অতর্কিত হামলা চালায়।
পাকিস্তানের অভিযান ‘গজব লিল হক’ ও ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান
এই পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) দাবি অনুযায়ী, আফগানিস্তানের অন্তত ২২টি স্থানে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। তাদের অভিযানের ভয়াবহতা সম্পর্কে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে তথ্য দিয়েছে তা নিচে তুলে ধরা হলো:
- নিহত: অন্তত ২৭৪ জন আফগান তালেবান সেনা ও সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত।
- সামরিক যান ধ্বংস: ১১৫টি ট্যাংক, সাঁজোয়াযান এবং কামান ধ্বংসের দাবি।
- ঘাঁটি ধ্বংস: ৭৩টি তালেবান সীমান্ত চৌকি মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
- নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি: পাকিস্তান জানিয়েছে, তাদের ১২ জন সেনা নিহত এবং ২৭ জন আহত হয়েছে।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতা তারার জানিয়েছেন, আফগানিস্তান থেকে ড্রোনের মাধ্যমে ইসলামাবাদ, নওশেরা ও অ্যাবোটাবাদে পাল্টা হামলার চেষ্টা করা হলেও তাদের অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম তা সফলভাবে রুখে দিয়েছে।
আফগানিস্তানের পাল্টা আঘাত: ৫৫ পাকিস্তানি সেনা হত্যার দাবি
পাকিস্তানের বিমান হামলার পর চুপ থাকেনি আফগানিস্তানও। তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন, আফগান বাহিনী পাকিস্তানের ১৯টি সীমান্ত চৌকি ধ্বংস করে দিয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী:
১. এই হামলায় ৫৫ জনের বেশি পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে।
২. বেশ কিছু পাকিস্তানি সৈন্যকে তারা বন্দি বা আটক করেছে।
৩. ইসলামাবাদ ও অ্যাবোটাবাদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে সফল বিমান অভিযান চালানো হয়েছে।
আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা যেকোনো পর্যায়ের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। তবে হামলায় সাধারণ মানুষের মৃত্যু নিয়ে গভীর শোক প্রকাশ করেছে কাবুল। পাকতিকা প্রদেশে পাকিস্তানি বোমা হামলায় এক নারী ও দুই শিশুসহ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ
দুই দেশের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধে সরব হয়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়। বিশেষ করে চীন এবং মালয়েশিয়া দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।
চীনের অবস্থান
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং জানিয়েছেন, বেইজিং এই ঘটনায় ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’। বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী হিসেবে চীন দুই দেশকেই আলোচনার টেবিলে বসে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দিয়েছে। চীন প্রয়োজনে মধ্যস্থতা করতেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বার্তা
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ফেসবুকে এক বার্তায় বলেন, পবিত্র রমজান মাসে দুই মুসলিম দেশের মধ্যে এই যুদ্ধ অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি পাকিস্তানের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব উভয়কেই সম্মান জানিয়ে দ্রুত সামরিক অভিযান বন্ধের অনুরোধ করেছেন।
পাকিস্তানের ভেতরেই শুরু হয়েছে সমালোচনা
সবাই কিন্তু এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন না। পাকিস্তানের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা মাওলানা ফজলুর রহমান এই অভিযানের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, একতরফা সামরিক হামলা সমস্যা সমাধানের বদলে জটিলতা আরও বাড়াবে। তিনি বলেন, “নিরাপত্তার বিষয়ে অভিযোগ থাকতেই পারে, কিন্তু প্রতিবেশী দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা উচিত নয়।”
আগামী দিনে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে?
আফগানিস্তানের সেনাপ্রধান ফসিউদ্দিন ফিতরাত সতর্ক করে বলেছেন, পাকিস্তান যদি হামলা বন্ধ না করে তবে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ জবাব দেওয়া হবে। অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, কোনো পক্ষই পিছু হটতে রাজি নয়। তবে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লে হয়তো দ্রুত আলোচনার পথ খুলতে পারে।
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের এই যুদ্ধ কেবল দুই দেশের ক্ষতি করছে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও অর্থনীতিকেও হুমকির মুখে ফেলছে। সাধারণ মানুষ এখন কেবল শান্তির প্রার্থনায় দিন গুনছেন।








